- ৬টির বাজেট নিয়ে ৪টি ক্রয়
- জড়িত সালমান এফ রহমান সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ ও শিপিং করপোরেশনের সাবেক এমডি
- বাজারদরের চেয়ে প্রতিটিতে প্রায় এক কোটি ডলার বেশি দিতে হচ্ছে

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ কেনার নামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ছয়টির বাজেট নিয়ে চারটি জাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এই চারটি জাহাজের প্রতিটিতে বাজারদরের চেয়ে প্রায় এক কোটি ডলার বেশি দিতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমান, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং শিপিং করপোরেশনের সাবেক এমডি কমোডর এস এম মনিরুজ্জামানের জোগসাজশে ছয়টির বাজেট নিয়ে চারটি জাহাজ কেনা হয়। এতে বিএসসির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তারা জাহাজ কেনার নামে এই বিপুল অর্থ লোপাট করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর ছুটির দিনে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সাথে জাহাজ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। এসব জাহাজ কেনার জন্য সালমান এফ রহমান, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং বিএসসির সাবেক এমডি কমোডর এস এম মনিরুজ্জামানের বিশেষ আগ্রহ ছিল। বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে জাহাজ কেনার পেছনে কমিশন বাণিজ্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, বিএসসি সিএমসি থেকে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ২৩৫ মিলিয়ন ডলারের ছয়টি জাহাজ কেনার জন্য উচ্চ সুদে ২.২% হারে ৮০ হাজার ক্যাপাসিটির বিডব্লিউটির তিনটি জাহাজ ও এক লাখ ১৪ হাজার ক্যাপাসিটির তিনটি ট্যাঙ্কার সরবরাহের জন্য প্রপোজাল দেয় ২০২০ সালে। পরে দাম বাড়ার অজুহাতে ২০২২ সালের তৎকালীন বাংলাদেশের শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর এস এম মনিরুজ্জামান, সালমান এফ রহমান, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সুকৌশলে সরকার/মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে সিএমসির সাথে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে ২০২২ সালে এই ২৩৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েই চারটি জাহাজ কেনার প্রস্তাব মন্ত্রণালয় হয়ে প্ল্যানিং কমিশনে পাঠায়। বিনা টেন্ডারে এই জাহাজগুলো সরাসরি সিএমসি থেকে কেনা হয়। এতে সরকারের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি জাহাজের দাম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সিএমসির জাহাজের দাম বেশি ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালে সে দেশের কার্যাদেশ নেয়া কয়েকটি জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি ৮০-৮২ হাজার ডিডব্লিউটি ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের দাম তিন কোটি ২০ লাখ থেকে তিন কোটি ৪০ লাখ ডলার। এই দাম বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ দেয়া জাহাজগুলোর চেয়ে প্রায় এক কোটি ডলার কম।
আর এক লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটি ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাঙ্কারের (আফরাম্যাক্স) দাম অন্য কোম্পানিগুলো নেয় ছয় কোটি ১০ লাখ থেকে ছয় কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এই জাহাজেও প্রতিটিতে এক কোটি ডলার বেশি দাম ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম কিস্তির অর্থ পরিশোধ করা হলে চীনের জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএমসি জাহাজ নির্মাণ শুরু করবে। এই প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি জাহাজ কিনতে দেশী মুদ্রায় খরচ হবে দুই হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। পাঁচ কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ সালের সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চীনের সাথে এই ঋণ নিয়ে আলোচনা শুরু করে বিএসসি। তখন ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি মাদার বাল্ক জাহাজ ও এক লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউটির তিনটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাংক কেনার কথা ছিল। পরে আড়াই বছর ধরে এ নিয়ে দর-কষাকষি চলে। কিন্তু তত দিনে ডলারের দাম বেড়ে যায়। এ ছাড়া জাহাজ তৈরির প্রধান উপকরণ লোহাসহ যাবতীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। যে কারণে চীনা কর্তৃপক্ষ ছয়টি জাহাজ দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। তাই বাংলাদেশ চারটি জাহাজ কিনতে রাজি হয়।
জানা গেছে, চীনা কর্তৃপক্ষের সাথে প্রায় আড়াই বছর দর-কষাকষির পর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দুই হাজার ৬২০ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়। এর মধ্যে চীন সরকারের ঋণ দুই হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। জানা গেছে, এই ঋণ পরিশোধের সময় ১৫ বছর। এর মধ্যে চার বছর গ্রেস পিরিয়ড। সব মিলিয়ে সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ।
চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) জাহাজগুলোর নকশা, পরিমাপসহ সবকিছু তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, চীনা ঋণের বিপরীতে দরপত্র আহ্বান করা হয়নি, এটি সরবরাহ ঋণ। প্রথম কিস্তি পরিশোধের পর সিএমসিকে জাহাজ বানানোর কথা বলা হবে। তখন তারা জাহাজ তৈরির কাজ শুরু করবে।
এ বিষয়ে বিএসসি একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরুর বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। ইআরডি তা শিগগিরই জানিয়ে দেবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আগের দরে জাহাজ মিলবে না।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, জাহাজের ভাড়া এক দশমাংশ কমে যাওয়ায় নতুন জাহাজ সংগ্রহ করা খুবই অপ্রয়োজনীয়, এ ছাড়া বেসরকারি খাতের অধীনে ৯৩টি সমুদ্রগামী জাহাজ কাজ করছে এবং সরকারি বহরে চারটি জাহাজ যোগ করলেও কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই অর্থনীতিবিদ আরো পরামর্শ দিয়েছেন যে, চীন যদি এই মূল্যে জাহাজ বিক্রি করতে রাজি না হয় তবে কর্তৃপক্ষের উচিত চুক্তিটি বাতিল করা।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও আওয়ামী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বিভিন্ন দফতরে সক্রিয়। যাতে করে সালমান এফ রহমান, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী গংদের পুরনো এজেন্ডাগুলো সহজেই বাস্তবায়ন করা যায়। সেই লক্ষ্যে এরই মধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বে-টার্মিনাল প্রকল্পও গ্রাস করার পায়তারা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।