ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সাথে মামলার আসামি তিনি। অথচ নিজেকে দাবি করেছেন আওয়ামী আমলে বৈষম্যের শিকার। এই দাবি জানিয়ে তিনি হয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী। অথচ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান নামের এই কর্মকর্তা কোনো দিনও বৈষম্যের শিকার হননি। আওয়ামী লীগের পুরো শাসনামলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদেই বহাল ছিলেন। ওই সময়ের দুর্নীতি নিয়ে এখন তদন্ত শুরু হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের পর হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিবুল হক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহিবুল হক গ্রেফতার হলেও তার দোসরদের অন্যতম কর্মকর্তা হলেন প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। গ্রেফতার হওয়া দুর্নীতিবাজ সাবেক সচিব মহিবুলের কল্যাণে হাবিবুর রহমান পাঁচ বছর ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং পিঅ্যান্ডডিকিউএস এ তিন বছর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসাবে দাপটের সাথে কার্যক্রম চালিয়েছেন। হাবিবুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ২ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজের বিপরীতে আগাম ১০ লাখ টাকা না পেলে ফাইলে স্বাক্ষর করতেন না। দুর্নীতি ও অপকর্মের কারণে কর্মজীবনে হাবিবুর রহমান কখনো স্ট্যান্ড রিলিজ, কখনো ওএসডি, আবার কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দফতরবিহীন থেকেছেন। অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও খামখেয়ালির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় হাবিবুর রহমানকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে বেবিচকের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব না দেয়ার জন্য বলা হয়। অথচ দুদকের এ আদেশ বাস্তবায়ন না করে উল্টো তাকে ফ্লাইট সেফটি থেকে এনে সরাসরি প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসানো হয়েছে। হাবিবুর রহমান নামের বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকেই গত ২৮ নভেম্বর সিভিল এভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রধান প্রকৌশলীর পদ পেয়েই তিনি উন্নয়ন এবং সংস্কার কাজ বাদ দিয়ে তার প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ইতোমধ্যে সিনিয়রকে বাদ দিয়ে নজিরবিহীনভাবে এক জুনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছেন। জানা গেছে, মেয়াদ পরিপূর্ণ হওয়ার ৪৫ দিন পূর্বে থার্ড টার্মিনালের পিডি এ কে এম মাকসুদুল ইসলামের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল চেয়ে গত ২২ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে ২৩ ডিসেম্বর বাতিল করার অনুরোধ করেছেন।
রাজধানীর কাওলায় একটি মসজিদসহ কার্যাদেশ দেয়ার পরও অসংখ্য কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেয়ার হুকুম দেয়া হয়েছে। মসজিদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ায় মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিমানবন্দর এলাকার একটি মসজিদের কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ দিকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ওয়ার্কস প্লান এখনো পাস না করায় নতুন ঠিকাদাররা কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাবিবুর রহমান ২০০২ সালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের কারণে তৎকালীন বিমানমন্ত্রী মীর নাছিরের নির্দেশে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সদর দফতরে পাঠান। ২০০৫ সালে কক্সবাজার এয়ারপোর্টে এয়ার এপ্রোন প্রজেক্টের ঠিকাদারের সাথে গণ্ডগোলের কারণে তাকে ওএসডি করে ঢাকায় পাঠানো হয়। ২০১১ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় গুরুতর অনিয়মের কারণে তাকে হেডকোয়ার্টারে আনা হয়।
গেলো নভেম্বরেও হাবিবুর রহমানকে প্রধান কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। কিন্তু তার পরও নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়াই শুধু নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বেশ কয়েকটি হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের দায়িত্ব পান তিনি।
সূত্র জানায়, বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গুরুত্বপূর্ণ সাতটি বিমানবন্দর উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন হাবিব। তার মধ্যে রয়েছে খানজাহান আলী বিমানবন্দর উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন, ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ ও নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ এবং প্যারালাল টক্সিওয়ে নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান টার্মিনালের সম্প্রসারণ নবরূপায়ন এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও রানওয়ে সম্প্রসারণ। তার অদক্ষতায় সিলেট বিমানবন্দরের উন্নয়ন কাজে নকশায় ত্রুটি ছিল বলেও জানা গেছে।

এ দিকে, দেশের তিনটি বিমানবন্দরের চারটি প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে পৃথক চার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৪ এপ্রিল ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ জাকির হোসেন গালিব দুদকের দায়ের করা পৃথক এ চার মামলার এজাহার গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যোগাযোগ, নেভিগেশন ও নজরদারি ব্যবস্থাপনা, রাডার স্থাপন প্রকল্পের আওতায় রাডার নির্মাণের সময় প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া, একই বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ (তৃতীয় টার্মিনাল) প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্প থেকে ২১২ কোটি টাকা এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল নির্মাণ ও রানওয়ে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
এই চার মামলায় তারিক সিদ্দিক ছাড়াও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মহিবুল হক ও বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান মহিবুলকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্মসচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক ও বেবিচকের সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।