আদালতের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততা নিশ্চিতকরণের জন্য বিচারকাজে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে- সুপ্রিম কোর্টসহ সব আদালতে মামলা দায়ের এবং দায়ের পরবর্তী অগ্রগতি, বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রহণীয় পদক্ষেপ, ধার্য তারিখ, প্রদত্ত আদেশ, পরবর্তী তারিখ, বিভিন্ন বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত ও রায়ের সব বিষয়ের সংক্ষিপ্ত সার প্রকাশের জন্য সুপ্রিম কোর্টে এবং জেলা পর্যায়ে নির্ধারিত ওয়েবসাইট থাকবে। প্রতিদিন সব বিচারক তার প্রদত্ত সিদ্ধান্ত বা ঘোষিত রায় ওয়েব সাইটে প্রকাশ করবেন। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদের অধীনে বিধি প্রণয়ন করতে হবে। এরূপ বিধি অনুসরণ ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে মনিটরিং কমিটি থাকবে। কমিটি নিয়মিতভাবে বিষয়টি তদারকি করবে এবং বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গত ১৮ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের যে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে তাতে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামীকাল ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে কমিশনের সদস্য তানিম হোসেইন শাওন জানিয়েছেন।
কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সাথে ই-জুডিশিয়ারি, ই-সমন/পরোয়ানা ব্যবস্থাপনা, স্থায়ী ডাটাবেজ প্রস্তুত, ই-কেইস ম্যানেজমেন্ট, ই-অফিস ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগের জন্য বিশেষভাবে নিম্নরূপ আইনের সংশোধনীর প্রয়োজন: দি কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮ : ই-ফাইলিং কার্যকর করতে, সমন জারির ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মেইল সার্ভিস (ই-মেইল) যুক্ত করার জন্য এবং বিচারকালে সাক্ষ্য রেকর্ডের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারের জন্য সংশোধন করতে হবে।

দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮ : অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ (ই-কমপ্লেইন) দায়েরের জন্য সেকশন ২০০, তদন্তকালে সাক্ষীদের জবানবন্দী রেকর্ড সংক্রান্ত সেকশন ১৬১ ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী গ্রহণ সংক্রান্ত সেকশন ৬৪ এবং সাক্ষ্য রেকর্ডের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারের জন্য সংশোধন করতে হবে।
দ্য সিভিল রুলস অ্যান্ড ওয়ার্ডাস : দেওয়ানি আদালতে ই-কজলিস্ট, কেইস ম্যানেজমেন্ট, অফিস ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল রেকর্ড রুম, ই-সার্টিফায়েড কপি সংক্রান্ত সফটওয়্যার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধি সংযোজন করতে হবে।

দ্য ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড ওয়ার্ডাস, ২০০৯ : ফৌজদারি ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ই-কজলিস্ট, কেইস ম্যানেজমেন্ট, অফিস ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল রেকর্ড রুম, ই-সার্টিফায়েড কপি সংক্রান্ত সফটওয়্যার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধি সংযোজন করতে হবে।
ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পে প্রস্তাবিত কার্যক্রমকে পরিকল্পনা মোতাবকে যথাসময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রকল্পের অধীন অন্তর্ভুক্ত থাকবে- জেআরপি (জুডিশিয়াল এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যার, ভার্চুয়াল কোর্ট, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও ই-স্বাক্ষর। ৬৪টি জেলায় ই-কোর্ট রুম (৪) ই-ফাইলিং। ই-পেমেন্ট, ই-নথি। ডিজিটাল রেকর্ডরুম ও ডিজিটাল অনুলিপি বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের কেন্দ্রীয় ডাটা সেন্টার ও সুপ্রিম কোর্টে মাইক্রো ডাটা সেন্টার। সেন্ট্রাল জেল টার্মিনাল। সব জেলা বারে ই-ক্যাফে।
ই-কেইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে প্রাথমিক পর্যায়ে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পের আওতায় যেসব প্রক্রিয়া সংযুক্ত করা যাবে তা নিম্নরূপ- (১) ই-কেইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ই-ফাইলিং মডিউলের মাধ্যমে দেওয়ানি মামলা এবং ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা যাবে। মডিউলের মধ্যে কোর্ট-ফি ক্যালকুলেটরও যুক্ত থাকতে হবে, যা দায়ের হওয়া মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে কোর্ট ফি কত হবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করে দিতে পারবে। ই-ফাইলিংয়ের জন্য নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেসের সাথে সংযুক্ত থাকবে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল যাচাইয়ের মাধ্যমে এটি সিস্টেম কার্য সম্পাদন করবে।

(২) ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে দায়েরকৃত মামলা সমূহের নিয়মিত বিচারিক কার্যাবলি ই-নথি ব্যবস্থারের মাধ্যমে সম্পাদন করতে হবে। ই-নথিতে আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন অনুসারে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর সার্টিফিকেট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ই-স্বাক্ষরের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
(৩) সব আদালতে ই-কজলিস্ট বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ই-কজলিস্টের মাধ্যমেই আদালতের কজলিস্ট ও ডায়েরি প্রস্তুত করা নিশ্চিত করতে হবে এবং মামলার আদেশের সংক্ষিপ্তসার আপলোড করতে হবে। ই-কজলিস্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত হবে। একইসাথে আদালতের রেজিস্টারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত হবে।

(৪) মামলা সম্পর্কে বিশদ তথ্যের জন্য আদালত চত্বরে সবার জন্য উন্মুক্ত কেস ট্র্যাকার মডিউল এবং মামলার পক্ষদের জন্য মামলার বিশদ তথ্যের জন্য শুধুমাত্র আদালত চত্বরের ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে কোর্ট এরিয়া নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, মামলার সব তথ্য অনলাইনে পাবলিক এক্সেস দেয়া ডাটা নিরাপত্তায় একটি ঝুঁকি হিসেবে গণ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে, কোনো মামলা বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য অনলাইনে রেখে মামলার বিশদ তথ্য কোর্ট এরিয়া নেটওয়ার্কে রাখা যেতে পারে অর্থাৎ, মামলার দরখাস্ত, আর্জি, সাক্ষ্য সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য শুধুমাত্র আদালতের এলাকায় থাকা সুনির্দিষ্ট এবং নিরাপদ ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হলেই দেখতে পাওয়া যাবে। এই প্রযুক্তির ব্যবহার তথ্য নিরাপত্তার সাথে সাথে বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে এবং বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমাবে।

(৫) ভার্চুয়াল কোর্ট মডিউল একটি অত্যাধুনিক সিস্টেম হবে, যা সাক্ষী ম্যানেজমেন্ট মডিউলের সাথে সংযুক্ত থাকবে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে সাক্ষীকে ভার্চুয়ালি সাক্ষ্য দিতে বা শুনানির জন্য ভার্চুয়ালি উপস্থিত হতে সাহায্য করা যাবে। এর মাধ্যমে আদালতে সশরীরে উপস্থিত না হওয়া ব্যক্তিদের জন্য বিচারপ্রক্রিয়া আরো সুষ্ঠু ও সময়সাশ্রয়ী হতে পারে।
(৬) সাক্ষী ম্যানেজমেন্ট, সরকারি সাক্ষী ক্যালেন্ডার এবং ন্যাশনাল উইটনেস ডাটাবেস তৈরি করতে হবে।

(৭) মামলার পক্ষ ও সাক্ষীদের পরিচয় যাচাইকরণ ব্যবস্থা থাকতে হবে এনআইডি নম্বর, জন্ম সনদ ইত্যাদির মাধ্যমে। সেই সাথে ফৌজদারি মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রোফাইলিংয়ের জন্য পৃথক মডিউল থাকতে পারে, যা আসামিদের প্রবেশন প্রদানের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
(৮) বিচারক, আইনজীবী, অ্যাডভোকেট কমিশনার, সরকারি কৌঁসুলি (জিপি), পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), কোর্ট স্টাফ ও মামলার পক্ষদের জন্য বিশেষায়িত পোর্টাল থাকতে হবে। কার্যভেদে প্রতিটি পোর্টালের জন্য পৃথক মোবাইল ও ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশন প্রস্তুত করা যেতে পারে কিংবা একই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে কাজের ধরন অনুযায়ী আলাদা আলাদা একসেস লেয়ার সৃষ্টি করতে হবে। দেওয়ানি আদালতের মোকদ্দমা নিষ্পত্তির সুবিধার্থে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (এওঝ) প্রযুক্তি, ল্যান্ড অ্যান্ড নিকাহ রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড আদার ইনফরমেশন মডিউল, ফ্যামিলি অ্যান্ড সিভিল এক্সিকিউশন কেস ম্যানেজমেন্ট মডিউল ইত্যাদি যুক্ত করতে হবে।

(৯) ই-কোর্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে আদালতের প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপ সহজ এবং সুসংগঠিত হবে। বাজেট ও ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত অ্যাক্সেস করা যাবে, এবং স্বয়ংক্রিয় প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব হবে। একইসাথে, কর্মচারীদের কার্যক্রম ও আদালতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধান করা যাবে, যা দক্ষ প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করবে। এই সিস্টেম আদালতের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাবে এবং বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের বিচারিককার্যক্রমে আরো বেশি মনোনিবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে- জুডিশিয়াল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যানালাইসিস পাবলিক পোর্টাল তৈরি করতে হবে। ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় ডাটা সেন্টার এবং প্রত্যেক জেলায় মাইক্রো ডাটা সেন্টার স্থাপন করতে হবে।

বিচারকদের বিচারিক কাজের মূল্যায়ন করার জন্য জুডিশিয়াল পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস মডিউল থাকতে হবে, যা বিচারিক কাজের পরিমাণ ও গুণমান বিভিন্ন মানদণ্ড ও উচ্চ আদালতের মতামতের ভিত্তিতে কাজ করবে।
আদালতের প্রশাসনিক কাজ এবং আদালতের বিভিন্ন শাখার কাজ সুব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তির সহায়তায় কোর্ট অ্যাডমিস্ট্রেশন ই-নথি সিস্টেম এবং কোর্ট অ্যাকাউন্টস, প্রসেস অ্যালোকেশন, মালখানা, হাজতখানা, অ্যাফিডেভিট, কোর্ট অ্যাসেট ও স্টেশনারি ম্যানেজমেন্ট প্রস্তুত করা যেতে পারে। ই-সার্টিফায়েড কপি সিস্টেম চালু করতে হবে।