ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের লুটপাটের আয়োজন সম্পন্ন করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। সম্প্রতি ডাকা দরপত্রে এমন কিছু অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় শর্তজুড়ে দেয়া হয়েছে; যাতে বিদেশী একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান ওই দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রভাবশালী একটি মহল বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে অন্যদের দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে না। এতে যন্ত্রপাতি সংগ্রহে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতি রোধ এবং উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের লক্ষ্যে ফায়ার সার্ভিসসহ বিশেষায়িত কয়েকটি সংস্থার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। বিষয়টি নজরে এনে ২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো যন্ত্রপাতি ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৭ সাল থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন, সিটি করপোরেশনসমূহ এবং ফায়ার সার্ভিসকে দেয়া হয়। এতে তাদের সক্ষমতা অনেকটা বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর এই একই প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে প্রকিউরমেন্ট অব ইকুপমেন্ট ফর সার্চ, রেসকিউ, অপারেশন অ্যান্ড এনার্জি কমিউনিকেশন ফর আর্থকোয়াক অ্যান্ড আর্দার্স ডিজাস্টার প্রজেক্ট (পেজ-৩) এর মাধ্যমে কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি প্রকল্পের আহ্বান করা দরপত্রের বিপরীতে ই-পিজি পদ্ধতিতে প্রাক দরপত্র সভায় সম্ভাব্য দরদাতার মতামত আহ্বান করা হয়। 
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ই-জিপি পদ্ধতিতে প্রাক দরপত্র সভায় অধিকাংশ দরদাতারা প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমের স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন নিয়ে আপত্তি তোলে। স্পেসিফিকেশন সংশোধন ও পরিমার্জনের অনলাইনে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়। কয়েকজন দরদাতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দেয়া স্পেসিফিকেশন অসৎ উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেয়ার  লক্ষ্যে সাজানো হয়েছে। স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন কমিটির অধিকাংশ সদস্য বিগত পতিত সরকারের সুবিধাভোগী। যারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্যের লক্ষ্যে সব যন্ত্রপাতি নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। 


সংশ্লিষ্টরা আরো বলেন, ‘ভূমিকম্পের রেসকিউ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাপানের কবুলকো, হিটাচি, কমারসো, আমেরিকার জন্ডেরি, তুরস্কের হাইড্রোম্যাক, সুইজারল্যান্ডের রিভারালসহ কোনো বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানিকে দরপত্র আহ্বানের সুযোগ রাখেনি। শুধু ক্যাটার ফিলার নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে অংশগ্রহণের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে এটি স্বীকৃত যে, স্বনামধন্য যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী বা প্রস্তুতকারীরা তার নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত গাড়ি, যন্ত্রপাতি, কনস্ট্রাকশন ইক্যুইপমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিন আন্তর্জাতিক মানে উৎপন্ন করে এআইএসও সার্টিফিকেট গ্রহণ করে। যার একটি ম্যানুফচারিং স্ট্যান্ডার্ড প্রসেস অনুযায়ী হয়। উল্লেখিত দরপত্রের স্পেসিফেকশন পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, সেখানে সুনির্দিষ্ট একটি আইএসও নম্বর রয়েছে শুধু বিশ্বে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য। আহ্বানকৃত দরপত্রে এক্সভেটর, ব্যাকহো লোডার, মোটর গ্রাডার, ক্রেস, ফর্ক লিফট, ডাম্প ট্রাক,  বুলডোজার ইত্যাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সব যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কাজ ওই একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার চেষ্টা চলছে। উল্লেখিত সরঞ্জামাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতিসমূহের যে পরিমাপ দেয়া হয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধিকাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তার স্বকীয়তা বজায় রেখে উৎপাদনকৃত এক্সভেটর, ব্যাকহো লোডার, মোটর গ্রাডার, ক্রেস, ফর্ক লিফট, ডাম্প ট্রাক,  বুলডোজার স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হবে। ইঞ্জিন স্ট্যান্ডার্ড, ক্যাবের উচ্চতা, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বাকেট, ব্লেড, ওয়ার্কিং রেঞ্জ ইত্যাদির ক্ষেত্রে এমন করে স্পেসিফিকেশন দেয়া হয়েছে যে, কয়েক মিলিমিটারের জন্য অধিকাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এই দরপত্রে অংশগ্রহণে বঞ্চিত হবে। কারণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মালিকরা তাদের নিজ নিজ স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে কয়েক মিলিমিটার হেরফেরের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। এসব স্পেসিফিকেশন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও প্রতিযোগিতা আইনেরও পরিপন্থী। 
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (যুগ্মসচিব) কাজী শফিকুল আলম বলেন, ‘যারা এই ক্রয় সংক্রান্ত দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না তারা হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের অপপ্রচার করতে পারে। যথাযথ নিয়মে দরপত্র ডাকা হয়েছে এবং বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমানের নম্বরে ফোন দেয়া হলে তিনি ফোন ধরেননি।