বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিমের দুর্নীতির খবর বন কর্মকর্তাদের মুখে মুখে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বন বিভাগকে দুর্নীতির ডেরায় পরিণত করেছেন তিনি। ফ্যাসিস্ট সরকারের বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারকে মা ডেকে গড়ে তুলেছেন অর্থসম্পদের পাহাড়। বিশ্বস্ত অধস্তনদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বিশাল সম্রাজ্য। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মোল্যা রেজাউল করিম শুধু চট্টগ্রামে নয়, খোদ বন অধিদফতরে একজন দানবীয় আতঙ্ক।
অভিযোগ উঠেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাভোগী মোল্যা রেজাউল নিজেকে সংস্কারপন্থী দাবি করে বন অধিদফতরে আন্দোলনের হুমকি দিয়ে বাগিয়ে নেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষকের চেয়ার। হাসিনা সরকার পতনের পর তার এই কাজে ২২তম বিসিএস বন ক্যাডারের কয়েজন বিতর্কিত ও ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা সহযোগিতা করেন। ২০০৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া মোল্যা রেজাউল করিম ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিএফ পদে পদায়ন পান।
নয়া দিগন্তের হাতে আসা নথি বলছে, বিগত ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো: ইউনুছ আলী মোল্যা রেজাউল করিমের দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে একের পর এক চিঠি দেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হওয়ায় মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। উল্টো তাকে ফেনী জেলা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদ থেকে পাল্পউড বাগান বিভাগ বন্দরবানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে প্রাইজ পোস্টিং দেয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়।
২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক মো: ইউনুছ আলী পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘মোল্যা রেজাউল ফেনীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় ২০১০-২০১১ ও ২০১১-২০১২ আর্থিক সনে বাগান উত্তোলনে ২ কোটি ৩১ লাখ ২৯ হাজার ৬৮০ টাকা ব্যয় করেন। তবে বাগানটি ব্যর্থ হওয়ায় সরকারি বরাদ্দের ওই পরিমাণ টাকা অর্থিক ক্ষতি হয়।’ মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বিগত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ও ৭ মে ২০১৫ সালে দুইবার পত্র প্রেরণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলেও প্রধান বন সংরক্ষকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
নথি পর্যালোচনা করে আরো জানা গেছে, মোল্যা রেজাউল করিম ঢাকা মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭-২০১৮ ও ২০১৮-২০১৯ আর্থিক সনে সিভিল অডিট অধিদফতর কর্তৃক অডিটকালে ১২টি সাধারণ অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। তিনি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও টিকাটুলি বলধা গার্ডেনের পরিচালক থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে সর্বমোট ২০ কোটি টাকা উন্নয়ন কাজের বরাদ্দের সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। গভীর নলকূপ স্থাপনে ৩০ লাখ টাকা খরচ হলেও দেখানো হয় সাড়ে ৭০ লাখের বেশি। পতিত পুকুর খননের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎসহ ভুয়া প্যাড কাগজ এবং বিল ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বন উপমন্ত্রী হাবিনুন নাহারের আস্থাভাজন হওয়ায় এসব দুর্নীতি তদন্তের পর মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তাকে ঢাকা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের সিএফ পদে প্রাইজ পোস্টিং দেয় বন মন্ত্রণালয়।
বন অধিদফতরে কর্মরত ২০ জন ফরেস্টার সম্প্রতি মোল্যা রেজাউল করিমের দুর্নীতি তদন্ত এবং তার স্বৈরাচারী আচরণ থেকে মুক্তি পেতে দুর্নীতি দমন কমিশন, বন সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, চাকরি জীবনের শুরুতে রাঙ্গামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে প্রশিক্ষণ কালেই মোল্যা রেজাউল ঘুষ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। কাপ্তাই রেঞ্জে সেগুন বাগান বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। পরে তৎকালীন সহকারী বন সংরক্ষক শাহাবুদ্দিন মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেও বন বিধ্বংসী কার্যক্রম থামাতে পারেননি। ফেনী ডিভিশনের দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি বাগান সৃজন ও ইকোপার্ক প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেন। তদন্তে প্রমাণ পেয়ে তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুছ আলী মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বন মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠান। যদিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বনমন্ত্রী হাসান মাহমুদের সহযোগিতায় প্রস্তাবের সেই ফাইল মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা পড়ে যায়। মোল্যা রেজাউল বাগেরহাট ডিভিশনের দায়িত্বে (ডিএফও) থাকাকালীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পিরোজপুরে ইকোপার্ক নির্মাণ প্রকল্পের বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন।
এ ব্যাপারে সাবেক এক প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) জানান, মোল্যা রেজাউলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্ত হয়েছিল। তদন্তে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে সেই প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখেনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, একটি চক্র তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির সব অভিযোগ মিথ্যা।