রাজধানী ঢাকার নিম্নাঞ্চল বিশেষ করে জলাভূমি ভরাট হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি জলাভূমি দখল-দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে একটু বৃষ্টিতে রাজধানীতে নেমে আসছে জলাবদ্ধতা ও জলজট। যার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করছেন সবাই। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা রাজধানীর জলাভূমিগুলো রক্ষা করা না গেলে রাজধানীর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে নগরবাসী।
দেশে মোট ৩৭৩টি জলাভূমি আছে, যার মোট আয়তন ৮,৫৮,৪৬০ হেক্টর। জলাভূমি আমাদের জীববৈচিত্র্য, শস্য, মাৎস্য এবং নানা রকম জলজ ফসল ও ফলের আঁধার। জলাভূমির পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি, উপকৃষির কাজকর্ম, মাৎস্য আহরণ ও পরিবহন ব্যবস্থা। জলাভূমি ভূ-ভাগের অবস্থার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। জলাভূমি পানি শোধনাগার, মৎস্যকুলের সব প্রাণীর আবাসস্থল এবং কোটি মানুষের খাদ্য হিসেবে ধান, চাল, গমের উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। তবে ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় পৃথিবীর ৬৪ ভাগ জলাভূমি বিলীন হয়ে গেছে। শহরের জলাভূমি ভরাটের মাত্রা অত্যধিক।
রাজধানীর জলাভূমির পরিমাণ এখন প্রায় শূন্যের কোটায়। সম্প্রতি সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (বিসিএএস) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। এতে বলা হয়, এক যুগে রাজধানীর জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চলের নব্বই ভাগ ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা শহরের চার পাশে কৃষিজমি হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলো দ্রুত ভরাট হয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে ইট-পাথরের আবাসনসহ রাস্তাঘাট। অপর দিকে এর আশপাশে একটু খালি জলাভূমিগুলোও দখল থেকে বাদ যাচ্ছে না। রাজধানীসহ আশপাশে কৃষিজমি ও জলাভূমি নেই বললেই চলে। এতে এক দিকে খাদ্যশস্য ও মাৎস্য সম্পদের উৎপাদন কমছে। অপর দিকে বৃষ্টির পানি তাড়াতাড়ি নামতেও পারছে না। এ কারণে একটু বৃষ্টি হলে নগরবাসী তাকে বন্যা বলে অভিহিত করে। এ গবেষণা থেকে দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও গুলশান আবাসিক এলাকায় সবুজের চিহ্নহ্ন নেই। দেখা গেছে কংক্রিটের আচ্ছাদন নেই এমন এলাকা মোট জমির মাত্র ৪ শতাংশ। ওই গবেষণায় বলা হয় ২০০৫ সালে বাড্ডায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৮৬ বর্গকিলোমিটার। ২০১০ সালে তা কমে হয় ৩ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার। ২০১২ সালে নেমে হয় মাত্র তিন বর্গকিলোমিটার।
বিআইডব্লিউটিএর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী তোফায়েল আহম্মেদ তার এক গবেষণা প্রবন্ধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে নয়া দিগন্ত প্রতিবদেককে জানান, প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম খাল নাব্য খালগুলো অপরিকল্পিত অদূরদর্শিতায় বন্ধকরণে অথবা নতুন নাব্য খালের অভাবে এই ধরনের সমস্যা। ১৯৮৮ সালের বন্যা ছিল দীর্ঘস্থায়ী। তিনি জানান, ওই সময়ের পর ঢাকা শহরের ভূ-প্রকৃতি বৈশিষ্ট্য যথেষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ঢাকার ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যায় সমুদ্রের প্রভাব যথেষ্ট ছিল। বাংলাদেশসহ ঢাকার সভ্যতা যখন বিপন্ন ও হুমকির সম্মুখীন, তখন ঢাকা শহরকে রক্ষা ও প্রশাসনিক কাজের ধারাবাহিকতায় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখতে ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলে ১৩৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ দ্রুত ও স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করতে বাধ্যবাধকতা ছিল। ঢাকার পূর্বাঞ্চলে ১২৪ বর্গকিলোমিটার ডিএনডি এলাকার ৬৪ বর্গকিলোমিটার এবং নারায়ণগঞ্জ ৩৩ বর্গকিলোমিটার বর্তমানে জলাবদ্ধতা সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ঢাকা মহানগরের ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার সম্প্রসারণ ও নগরায়নে জলাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ব্যতয় সৃষ্টি হলে গুরুত্ব প্রদান করা না হলে ঢাকার মতো অনুরূপ জনদুর্ভোগ নেমে আসবে।
তবে বিসিএএসের সমীক্ষায় উঠে আসে ঢাকার জলাভূমি ভরাট হয়ে শহর থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। বিশেষ করে পানিনিষ্কাশন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাড্ডা, সাঁতারকূল, খিলক্ষেত, রামপুরা, দক্ষিণ ও উত্তর খানের বেশির ভাগ এলাকা একসময় জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল ছিল, যার নব্বইভাগই এখন ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভেতের সবুজ বনানী, কৃষিজমি ও জলাশয় থাকলেও তা ধ্বংস হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জমি ছিল সবুজে ঢাকা, ছিল নদী ও জলাশয়। গত এক যুগে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন, নেমে এসেছে বিপর্যয়। আর এমন ধরনের কঠিন বাস্তবতায় আজ পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব জলাভূমি দিবস। আজ এ দিবস পালনের জন্য বিভিন্ন সংগঠন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।



