বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রফিট বোনাস আটকে রেখে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের প্রমাণ পেয়েছে পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্তে কোম্পানি পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। এতে দেশের একমাত্র কয়লা খনিটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে সম্প্রতি ওই প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনটি নিয়ে সংসদীয় কমিটির আগামী বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
এর আগে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলুর রহমানের নির্দেশে প্রফিট বোনাস আটকে রেখে কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবার কাছ থেকে মাথাপিছু ৪০ হাজার টাকা করে প্রায় ৬০ লাখ টাকা আদায়ের ঘটনা গণমাধ্যমে ফাঁস হলে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ২৯ জানুয়ারি পেট্রোবাংলার জিএম (মাইন অপরেশন) ডি এম জোবায়েদ হোসেনকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটিতে গত ৩ মার্চ পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) শামীম হাসানকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কমিটি ওই কোম্পানির ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে গত ৬ মে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।
কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক কয়লা খনির উৎপাদন পরিকল্পনা ও সুষ্ঠুভাবে কোম্পানি পরিচালনা কাজে মনোনিবেশ না করে কোনো কারণ ছাড়াই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, শোকজ, পরামর্শপত্র, সতর্কতাপত্র ও এসিআর খারাপ দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এসব কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ক্ষোভ যেকোনো সময় বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে একাধিকবার বিক্ষোভ সমাবেশও করেছে। এতকিছুর পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু ব্যাখ্যা চেয়েছে পেট্রোবাংলা।
এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্য শামসুর রহমান শরীফ সাংবাদিকদের জানান, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আগেও কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে তদন্ত প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ফজলুর রহমান গত বছর আগস্টে বড়পুকুরিয়া কয়লা কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চলতি দায়িত্ব নিয়েই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি প্রফিট বোনাস আটকে রেখে উপর মহলকে দেয়ার নাম করে কয়লা খনি কোম্পানির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে মাথাপিছু এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপত্তির মুখে টাকার অঙ্ক কমিয়ে মাথাপিছু ৬০ হাজার টাকা ধার্য করেন। এতেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আপত্তি জানালে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। এ ছাড়া চুক্তি লঙ্ঘন করে চীনা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক অবৈধ সুবিধা প্রদানসহ কোম্পানিতে নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনা হয়।
সূত্র জানায়, বারবার অনিয়ম-দুর্নীতি করলেও মূলত চার খুঁটির জোরে রক্ষা পাচ্ছেন ফজলুর রহমান। এদের একজন মন্ত্রণালয়ের এবং আরেকজন পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তা। এর বাইরে বাকি দুই কর্মকর্তা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতেই কর্মরত। তাদের একজন জিএম- প্রশাসন (চলতি দায়িত্ব) সাইফুল ইসলাম দিপু এবং অন্যজন ম্যানেজার (মাইনিং) মোশাররফ হোসেন। এর মধ্যে সাইফুল ইসলাম দিপু পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রশাসনের বন্ধু। মূলত তিনিই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে ফজলুর রহমানকে রক্ষা করছেন। এর বিনিময়ে সাইফুল ইসলাম দিপুকে বড়পুকুরিয়া কয়লা কোম্পানির এমডি বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। পুরস্কারস্বরূপ কোম্পানি সচিব হিসেবে তাকে অতিরিক্ত দায়িত্বও দেয়া হয়েছে। তিনি অবৈধভাবে কোম্পানির চারটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। বেশির ভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করে নিচ্ছেন বাড়তি টিএ-ডিএ। জিএম (প্রশাসন) হওয়ার পরই সাইফুল ইসলাম দিপু বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে আগে চাকরিচ্যুত গাড়িচালক রফিকুল ইসলামের চাকরি ফিরিয়ে দেন। অথচ তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার পর কোম্পানির তদন্তে তার সার্টিফিকেট জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে।
এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন দুর্নীতি মামলার আসামি ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন সরকার। সম্প্রতি তাকে জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ দায়িত্বের কথা বলে অবৈধভাবে গাড়ি ব্যবহারসহ নানা সুবিধা নিচ্ছেন তিনি। এ দুই কর্মকর্তার পরামর্শে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অহেতুক হয়রানি করছেন ফজলুর রহমান। এতে পুরো কোম্পানিতে একটি বিরূপ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলেও কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে চাঁদাবাজির শাস্তি হয়নি
সংসদীয় কমিটিতে তদন্ত প্রতিবেদন
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রফিট বোনাস আটকে রেখে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের প্রমাণ পেয়েছে পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্তে কোম্পানি পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও...



