মদ, জুয়া, ক্যাসিনো ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের গতি কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ওপর। অভিযানের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে কথিত রাঘববোয়ালদের ধরা হবে নাকি সীমিত আকারে চলবে তার চূড়ান্ত নির্দেশনা দিবেন শেখ হাসিনা। এরপরই কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে আপাতত ছোট পরিসরে হলেও অভিযান চলবে বলে আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

সূত্রগুলো জানায়, প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেয়ার আগে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। ইতোমধ্যেই গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে আরো বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্যাসিনো, জুয়া, মাদক ও চাঁদাবাজির সাথে অত্যন্ত স্পর্শকাতর নামগুলো জড়িত থাকার কথা আসায় আপাতত বড় ধরনের অভিযানে যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করায় তার সাথে এসব নিয়ে আপাতত কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হচ্ছে না। আগামী ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে এসব তথ্য তার সামনে পেশ করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এরপরই প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিয়ে অভিযানের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তিনজন নেতা বলেন, অনেকটা হঠাৎ করেই শুরু হওয়া এই শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তবে দলের মনোনয়ন বোর্ড, কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক এবং ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রীর যে মনোভাব তারা দেখেছেন তা অত্যন্ত কঠোর। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী এই অভিযান আরো জোরদার হওয়ার কথা। তবে গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যানুযায়ী বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেভাবে প্রভাবশালী মহলের কথা আসছে তাতে চমকে গেছেন অনেকে। তাই প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হতে পারে। একইসাথে চলমান শুদ্ধি অভিযানের গতি কোন দিকে মোড় নিবে সেটাও স্পষ্ট হয়ে যাবে। 

সম্প্রতি দলীয় এক সভায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও ক্যাসিনোর সাথে জড়িত থাকায় যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাট ও দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ব্যাপারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দল ও সরকারের ইমেজ রক্ষায় তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর একাধিক হত্যা মামলার আসামি খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়। অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে একে একে গ্রেফতার করা হয় যুবলীগের আরেক কেন্দ্রীয় নেতা টেন্ডারবাজ জি কে শামীম, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম ফিরোজ এবং মোহামেডানের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেনকে। এ ছাড়া অভিযান চালানো হয়েছে গেন্ডারিয়া আওয়ামী লীগের দুই নেতার বাসাসহ রাজধানীর একাধিক বার ও ক্লাবে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ টাকা, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

বিভিন্ন সূত্র বলছে, গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য এবং চলমান অভিযানের বেশির ভাগ জায়গায় অবৈধ এসব ব্যবসা, টেন্ডার ও চাঁদাবাজির সাথে যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাটের নাম উঠে আসে। উঠে আসে যুবলীগ দক্ষিণের নেতা ও কমিশনার মমিনুল হক সাঈদ, সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস মিজান, যুবলীগের দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো: আবু কাউছার, মহানগর উত্তরের শীর্ষ নেতা ও কাওরানবাজার এলাকার কাউন্সিলর, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগ সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ও দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজার নাম। একইসাথে অভিযুক্ত এসব নেতার গডফাদার হিসেবে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের আরো সিনিয়র অনেক নেতার নাম গণমাধ্যমে আসছে। তাদেরকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দল, সরকার ও প্রশাসনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। 

সরকারের একটি সূত্র জানায়, চলমান অভিযান দেশের আপামর জনগণের কাছে দল সরকারের ইমেজ বাড়িয়েছে। তাই যত বড় রাঘলবোয়ালই হোক না কেন তাদেরকে ছাড় দিতে নারাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগেও তিনি প্রশাসনের প্রতি এমন নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু ক্যাসিনোসহ রাজধানীর অন্ধকার জগতের সব কিছুর সাথে কিছু রাঘলবোয়ালের নাম আসায় খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে আছে অভিযান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই সেটি কেটে যাবে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এ প্রতিবেদককে বলেন, শুদ্ধি অভিযানের পরিণতি কত দূর যাবে, কতজন গ্রেফতার হবে, কত দিন চলবে, কোন পর্যায়ে গ্রেফতার হবে, শুধু কি রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে নাকি প্রশাসনেও ধরা হবেÑ সব কিছু নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি দেশে ফিরলে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, শুধু গডফাদার নয়, গ্র্যান্ডফাদাররাও রেহাই পাবে না। অভিযুক্তরা যত বড়ই হোক না কেন আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে নির্দেশ দিয়ে গেছেন এ অভিযান চলবে। রাজধানী ছেড়ে পর্যায়ক্রমে বাইরে এ অভিযান শুরু হবে। যত প্রভাবশালীই হোক না কেন কেউ পার পাবে না।