সৃজনশীল নিয়ে দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার শিক্ষার্থীদের অনেক অভিভাবক ও শিক্ষকরা মনে করেন শিক্ষকদের মানোন্নয়ন না করে সৃজনশীল চালু করা উচিত হয়নি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সৃজনশীল পদ্ধতি উপযুক্ত নয়। এখনো সৃজনশীলের চেয়ে আগের পদ্ধতিকেই ভালো মনে করেন তারা। ছাত্রদের অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, বেশির ভাগ শিক্ষক সৃজনশীল বোঝেন না। আর যেসব শিক্ষক সৃজনশীল বোঝেন তাদের অনেকে আবার ক্লাসে ঠিকমতো পড়ান না। তারা পড়ান প্রাইভেটে।
বর্তমানে দেশে সীমিতসংখ্যক সরকারি স্কুল ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা খাত মূলত পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি স্কুলের মাধ্যমে। আর আর্থিক কারণে বেসরকারি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরাজ করছে শিক্ষকদের করুণ চিত্র। বর্তমানে সারা দেশে ৩৮ হাজার ৪৭৮টি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে। অপর দিকে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের তথ্যানুসারে বর্তমানে দেশে ৫ হাজার ২৪২টি নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুসারে হাইস্কুলের একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক চাকরির শুরুতে সর্বসাকুল্যে বেতন পান ১৩ হাজার ২৫০ টাকা। কলেজের একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক চাকরির শুরুতে বেতন পান ২৩ হাজার ৫ শ’ টাকা। এর মধ্যে এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া ও ৫ শ’ টাকা চিকিৎসা ভাতা রয়েছে।
শিক্ষকদের প্রতি মাসের বেতন থেকে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড ও বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট মোট ৬ শতাংশ টাকা কেটে রাখে।
রাজধানীর নাম করা যেসব বেসরকারি স্কুল রয়েছে তার মধ্যে কিছু রয়েছে এমপিওভুক্ত আর কিছু রয়েছে সম্পূর্ণ নন-এমপিও। কিন্তু নামকরা এসব নন -এমপিও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা সামান্য বেতনে শিক্ষকতা করেন। মূলত প্রাইভেট পড়িয়ে বাড়তি কিছু আয়ের আশায়ই অনেকে এসব স্কুলে সামান্য বেতনে শিক্ষকতায় যোগ দেন।
বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার এ নাজুক চিত্রের কারণে দেশের মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চান না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যারা অন্য কোথাও কিছু করতে পারেন না তারা বাধ্য হয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ফলে বাড়ছে না শিক্ষার মান। এ বক্তব্য শিক্ষকদেরই।
এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক বলেন, এর ফলে বেসরকারি স্কুলে যারা শিক্ষকতায় আসেন তাদের অনেকের মান নিয়ে প্রশ্নে রয়েছে। তাদের অনেকেই সৃজনশীল বোঝেন না। যেখানে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা বলতে গেলে পুরোপুরি বেসরকারি খাতে পরিচালিত হচ্ছে এবং আর্থিক কারণে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের করুণ চিত্র বিরাজ করছে সেখানে সৃজনশীলের মতো ব্যবস্থা চালু করা ঠিক হয়নি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এখনো আগের পদ্ধতিই ভালো। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করলেন, জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে আমাদের ওপর সৃজনশীল পদ্ধতি।
এক সময় গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন ও প্রশ্নের সংখ্যা নিয়ে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে এর বিপক্ষে আন্দোলনের জন্য। তাদের সাথে তখন যোগ দেন অনেক অভিভাবকও।
সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনেই সৃজনশীল পদ্ধতির নাজুক চিত্র ধরা পড়ে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছর জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সৃজনশীল পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পেরেছেন ৫৮ ভাগ শিক্ষক।
২০১০ সালে দেশে এসএসসি পর্যায়ে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। বর্তমানে প্রাথমিক থেকে এইচএসসি পর্যন্ত এ পদ্ধতি চালু রয়েছে। এ নিয়ে শুরু থেকেই ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।