জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদকে দলটির চিফ প্যাট্রন করা হচ্ছে। আজ শনিবার জাপার নবম কাউন্সিলে রওশন এরশাদকে এই পদ দেয়া হবে। চিফ প্যাট্রন হিসেবে জাতীয় পার্টিতে রওশন এরশাদের সম্মান হবে ‘সর্বোচ্চ’। জাতীয় পার্টির আজকের কাউন্সিলে দলে এই নতুন পদ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমানে ‘সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান’ পদে থাকা রওশনের নতুন পদের নাম হবে চিফ প্যাট্রন বা প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর চেয়ারম্যান পদে এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদেরই বহাল থাকছেন।
এ দিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর নানা আলোচনা আর টানাপড়েনের মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রথম কাউন্সিল আজ শনিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের বাইরে হবে কাউন্সিলের উদ্বোধন অনুষ্ঠান। দুপুরে মিলনায়তনের ভেতরে হবে ভোটাভুটি। জাপার কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের মৌখিক ভোটে চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নেতা নির্বাচন করা হবে। জাপার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার জাপার প্রেসিডিয়াম বৈঠক শেষে দলের মহাসচিব ও সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা এমপি এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, এবারের সম্মেলনে মূল আকর্ষণ দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদকে ‘চিফ প্যাট্রন’ নির্বাচিত করা হচ্ছে। দলে তার সম্মান থাকবে সর্বোচ্চ। মিটিং বা সাধারণ সভাসহ সবখানেই তার এই সম্মান থাকবে। সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও ‘চিফ প্যাট্রন’ পদের মধ্যে মর্যাদার ভারসাম্য কিভাবে রক্ষা করা হবেÑ জানতে চাইলে রাঙ্গা বলেন, দলের সব ক্ষেত্রে রওশন এরশাদের অবস্থান দলের চেয়ারম্যানের ওপরে থাকবে। এটি চেয়ারম্যান জি এম কাদেরই বলেছেন। চেয়ারম্যানের কাছে দলের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যত মিটিং হবে, তিনি তাতে সভাপতিত্ব করবেন। তবে রওশন এরশাদ যতদিন জীবিত থাকবেন, তত দিন তিনিই ‘চিফ প্যাট্রন’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রসঙ্গত, জাপার গঠনতন্ত্রের ২০/ক উপধারায় দলের চেয়ারম্যানকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। সেই ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হবে জি এম কাদের জানালেও রাঙ্গা বলেন, নবম কাউন্সিলে এটি সংশোধন হচ্ছে না। গঠনতন্ত্রের ২০/ক উপধারা প্রয়োগের আগে চেয়ারম্যান দলের কো-চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন। জাপা কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে চলে না। এখন থেকে দলের সিদ্ধান্ত এককভাবে কেউ দেবেন না। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দলের কো-চেয়ারম্যান মিলে সিদ্ধান্ত দেবেন। চেয়ারম্যানও এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে চান না।
রওশনের নতুন পদ সৃষ্টি হলে দলের চেয়ারম্যানের সাথে দ্বন্দ্ব আরো বাড়বে কি না- জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব বলেন, এটি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কোনো বিরোধ তৈরিও হবে না। চিফ প্যাট্রন, চেয়ারম্যান ও মহাসচিব মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন। পার্টির গঠনতন্ত্রে আরো অনেক ধারায় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সভায় দলের নেতারা পরিবর্তনের দাবি এনেছেন। পরে পরিবর্তন, সংযোজন, পরিবর্ধনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চেয়ারম্যানকে। জাপায় এখন ৪১ জন প্রেসিডিয়াম সদস্য রয়েছেন। বৈঠকে এই সংখ্যা কমিয়ে আনার পক্ষে মত এসেছে।
প্রেসিডিয়ামে সদস্য সংখ্যা কমবে না বাড়বেÑ সেই সিদ্ধান্ত দলের নবম কাউন্সিলের পর নেয়া হবে। কাউন্সিলে ‘চার-পাঁচজনকে’ দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যান পদেও আনা হতে পারে। জাপার কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের মৌখিক ভোটে চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নেতা নির্বাচন করা হবে বলেও তিনি জানান।
উল্লেখ্য, গত ২০১৬ সালে মার্চে পার্টির অষ্টম কাউন্সিলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দলে কো-চেয়ারম্যানের পদ তৈরি করে তাতে ভাই জি এম কাদেরকে আসীন করেন। স্ত্রী রওশন এরশাদ তাতে ক্ষিপ্ত হলে পরে তার জন্য এরশাদ তৈরি করেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানের পদ। ঠিক তখন থেকেই রওশন আর জি এম কাদেরের দ্বন্দ্ব আরো প্রকাশ্যে আসে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অসুস্থ অবস্থায় চলতি বছরের ৫ মে তার ছোট ভাই জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। পরে ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এরশাদ। এর চার দিনের মাথায় বনানীতে পার্টি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করেন। তার পাল্টায় রওশনপন্থীরা পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে রওশন এরশাদকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনার কথা বলে। পরে দুই পক্ষের সমঝোতা হলে ৮ সেপ্টেম্বর আরেক সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্গা জানান, জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন। আর রওশন এরশাদ হবেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। সেই সমঝোতার পর রওশনকে সংসদ অধিবেশনে দেখা গেলেও দলের কার্যক্রম থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। এই দূরত্ব ঘোচাতেই দলের নবম কাউন্সিলে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ দিয়ে তাকে নতুন পদে বসানোর পরিকল্পনা হয়েছে বলে আভাস দিলেন জাতীয় পার্টির এক সিনিয়র নেতা। রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত ওই নেতা বলেন, দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ নিতে রওশন এরশাদেরও সম্মতি রয়েছে।
এ দিকে দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা গতকাল সাংবাদিকদের কাছে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলেন, পার্টির চেয়ারম্যানের কাছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকবে। যত মিটিং হবে, তা তিনি প্রিজাইড করবেন। তবে যেহেতু হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী এখনো জীবিত, তাই তিনি যত দিন জীবিত রয়েছেন, তিনি চিফ প্যাট্রন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় পার্টির বেশ ক’টি সহযোগী সংগঠন কাউন্সিলে অঙ্গসংগঠনের স্বীকৃতি পাবে বলেও জানান জাপা মহাসচিব।
রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের পাশাপাশি সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকেও গতকালকের প্রেসিডিয়াম সভায় দেখা গেছে। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে মহাসচিবের পদ হারানোর পর এই প্রথম তিনি সভায় যোগ দিলেন।



