যেকোনো সিরিজ শুরুর আগে দুই দলের শক্তিমত্তা, দুর্বলতা ও কার কতটা সম্ভাবনা সেটি নিয়ে আলোচনাই ক্রিকেটের প্রচলিত রীতি; কিন্তু আজ থেকে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তিন ম্যাচের যে ওয়ানডে সিরিজ শুরু হচ্ছে সেখানে সিরিজ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনাকে একপাশে সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে অন্য কিছু। আজ সিরিজ শুরু হচ্ছে বলেই নয়; বরং জিম্বাবুয়ে ঢাকায় আসার পর থেকেই আলোচনায় এই ‘অন্য কিছু’। সেটি অবশ্যই মাশরাফি প্রসঙ্গ।
সাধারণত কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্ট শেষ হলে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে সেটি কারো নামের সাথে জুড়ে যায়; কিন্তু এবারের সিরিজটি শুরুর আগেই সেটি হয়ে গেছে ‘মাশরাফির সিরিজ’। অবশ্য আরেকটি শব্দ এর সাথে আছেÑ ‘শেষ’। অধিনায়ক মাশরাফি এই সিরিজেই শেষবারের মতো টস করতে নামবেন বাংলাদেশের হয়ে। মাশরাফি বিন মুর্তজা বাংলাদেশের ক্রিকেটের এমন একজন, যার দলে থাকা-না থাকাÑ সব কিছুই আলোচনার জন্ম দেয়। তার ওপর গত বিশ্বকাপের পর থেকে তার অবসর নিয়ে নানা গুঞ্জন; এসব আলোচনার হালে পানি দিয়েছে। সেসব পাড়ি দিয়ে জিম্বাবুয়ে সিরিজ যখন সামনে এলো, তখন সেই সিরিজে ওয়ানডে অধিনায়ক খেলবেন কি না শুরুতে সেটি নিয়েই ছিল সব কৌতূহল। এরপর জানা গেলÑ মাশরাফি খেলবেন। তবে বিসিবি সভাপতি জানিয়ে দিলেন, অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফির এটিই শেষ সিরিজ। আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তারা এখনই নতুন অধিনায়ক ঠিক করতে চান। অর্থাৎ নেতা মাশরাফির শেষ এখানেই।
এই যে সিরিজ শুরুর আগে মাঠের লড়াই ছাড়া অন্য আলোচনা, সেটির দায় অবশ্যই জিম্বাবুয়ের। নব্বইয়ের দশকে বিশ্ব-ক্রিকেটে সমীহ জাগানিয়া দল জিম্বাবুয়ে এখন আছে তার ছায়া হয়ে। অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, খেলোয়াড় বিদ্রোহÑ সব কিছু মিলে জিম্বাবুয়ে দলটি ২০০৫ সালের পর থেকেই আর আগের রূপে নেই। যে কারণে দুই দলের মুখোমুখি সাক্ষাতে শুরুর দিকে তাদের দাপট থাকলেও এর পর থেকে একচেটিয়া দাপট বাংলাদেশের। বাংলাদেশ দল এখন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে লড়াইয়ের আগে এগিয়ে থেকেই মাঠে নামে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শুধু জয় নয়, সিরিজ জয় কিংবা জয়ের ব্যবধানটা কত বড় হবে বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের কাছে সেটিই এখন শুধু গুরুত্ব পায়। তারওপর মিরপুরে একমাত্র টেস্ট ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশ দল ফিরেছে জয়ের ধারায়।
আফগানিস্তান, ভারত ও পাকিস্তানের কাছে একের পর এক হারে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে জিম্বাাবুয়েকে সামনে পেয়ে। এই ধারাটা ওয়ানডে সিরিজেও রাখতে চাইবে মাশরাফি বাহিনী। তার ওপর শেষ সিরিজে নিশ্চয়ই নেতা মাশরাফিকে সেরাটা দিয়েই বিদায় দিতে চাইবে তার সতীর্থরা। আবার মাশরাফিও নিশ্চয়ই চাইবেন বিদায়বেলা রাঙিয়ে যেতে। সব কিছু মিলে তাই হোয়াইটওয়াশই একমাত্র লক্ষ্য বাংলাদেশের।
অবশ্য ওয়ানডের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলবে না। দীর্ঘ সাত মাস পর ওয়ানডে খেলতে নামছে বাংলাদেশ। গত বছর জুলাইতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাদের মাটিতে তিন ম্যাচে ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। তার আগে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ১০ দলের মধ্যে পয়েন্ট টেবিলে স্থান হয়েছে ৮ নম্বরে। বিশ্বকাপের আগে অবশ্য আয়ারল্যান্ডে তৃদেশীয় সিরজে শিরোপা জিতেছে দল। তবে এত কিছুর পরেও এই সিরিজে দেশের মাটিতে ফেবারিট হয়েই মাঠে নামছে বাংলাদেশ। কারণ একটাইÑ প্রতিপক্ষের নাম জিম্বাবুয়ে।
টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি সব কিছু মিলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খারাপ হলেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে দাপুটে জয় টাইগারদের আত্মবিশ্বাসী করেছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও তাই বলে। গত কয়েক বছর ধরেই জিম্বাবুয়ে পাত্তা পাচ্ছে না বাংলাদেশের কাছে। গত ১৩টি ওয়ানডেতে জয় বাংলাদেশের। সর্বশেষ তিনটি ওয়ানডে সিরিজেই জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ। তাই এবার চতুর্থ হোয়াইটওয়াশ আদায় করে নেয়ার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে টাইগাররা।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে হারের স্বাদ কী তা জানেন না দলের বেশির ভাগ ক্রিকেটার। ২০১৩ সালে বুলাওয়েতে সর্বশেষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। বর্তমান দলের মাত্র চারজন ছিলেন। সেই দলে ছিলেনÑ তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহীম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মাশরাফি বিন মুর্তজা। ওই সিরিজের পর জিম্বাবুয়ের সাথে ১৩টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। সবগুলোতেই জয়।
অন্য দিকে জিম্বাবুয়ে চাইছে ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে। এই সিলেট স্টেডিয়ামেই বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০১৮ সালে টেস্ট জেতার সুখস্মৃতি আছে তাদের। সেটিকে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে সেরাটা দিতেই চাইবে শন উইলিয়ামসের দল। এর আগে ৭২ বার মুখোমুুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে। বিশ্বের যেকোনো দলের চেয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বেশি ম্যাচ খেলেছে টাইগাররা। ৭২ ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৪টিতে জয় পায়। ২৮টিতে জিতেছে জিম্বাবুয়ে।