আমের মওসুম এলেই আমের তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত ভোলাহাটের অর্থনীতির চাকা ঘুরে দাঁড়ায়। আমচাষিদের মুখে হাসি ফুটে। কিন্তু এ বছর মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে আমের দাম না পাওয়া কিংবা ফলন কম হওয়া নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছে আমচাষি ও আম ব্যবসায়ীরা। এ বছর আম উৎপাদনের আশা তো ছেড়েই দিয়েছে আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। এক দিকে আম গাছে আম নাই, তার ওপর করোনা দুর্যোগের কারণে আর্থিক সঙ্কট। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গোনা ছাড়া কোনো পথ নেই তাদের। গেল টানা তিন বছর ধরে চলছে আমের দরপতন। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এবার না জানি কপালে কী আছে এমন দুশ্চিন্তা তাড়া করে ফিরছে তাদের।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভোলাহাট উপজেলায় মোট তিন হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে আমগাছ রয়েছে। উৎপাদিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৫৪ টন। গেল বছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৪১৭ টন। এ বছর গাছে গাছে প্রচুর মুকুল এলেও অসময়ে বৃষ্টি হওয়ায় ধুয়ে মুছে শেষ হয় গুঠি আসা। উৎপাদিত লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশ আম উৎপাদিত হবে কি না এমন আশঙ্কায় হতাশ আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। এ দিকে আম মৌসুমে ভোলাহাটের একটি মাত্র নির্ধারিত আম বিক্রয় কেন্দ্র আম ফাউন্ডেশন ভোলাহাটে আম বেচাকেনার সময় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ওই মৌসুমে বসে ৮০ থেকে ৯০টি আমের আড়ত। একেকটি আড়তে কাজ করে ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক। খাবার হোটেল, ছোট ছোট দোকান, ট্রাক, ভ্যানসহ যুক্ত হয় অনেক কিছু।
আম উৎপাদন না হওয়ায় ভোলাহাটের বিশাল জনগোষ্ঠী থাকবে বেকার। অভাবের কারণে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ দিকে আম ফাউন্ডেশন ভোলাহাটে কোটি কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়। আম এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এ বছর আমের উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় মানুষ যেমন বেকার থাকবে তেমনি চাষি ও ব্যবসায়ীরা ঋণগ্রস্ত হবে। এনজিও সংস্থা কিংবা ব্যাংকে নেয়া ঋণের টাকা শোধ নিয়ে পড়তে হবে বেকায়দায়।
বড়গাছী বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ও আম ব্যবসায়ী মিঠু জানান, মৌসুমের শুরুতে আমগাছে পর্যাপ্ত মুকুল এসেছিল। তবে বৃষ্টির কারণে মুকুল সব নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া পরপর কয়েক বছর আমের দাম না পাওয়ায় বাগান পরিচর্যায়ও এক ধরনের অনীহা ছিল আমচাষিদের। এ বছর ২০ শতাংশ আমগাছে আম এসেছে বলে তিনি জানান।
বজরাটেক গ্রামের আমচাষি বাবুল আক্তার বাবু জানান, আমগাছে এ বছর প্রচুর মুকুল এলেও গুঠি আসেনি। ফলে তিনি হতাশায় দিন গুনছেন। এনজিও সংস্থা থেকে নেয়া তার ঋণ কিভাবে শোধ করবেন এ নিয়ে হতাশায় রয়েছেন।
আড়তদার নজরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি আম মৌসুমে কিছু বেকার ছেলে ও শ্রমিককে তার আড়তে কাজে লাগান। তার আড়ত থেকে তাদের সংসার চলে। কিন্তু এ বছর আম উৎপাদন না হওয়ায় আড়ত চালু করা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। তিনি জানান, মৌসুমে তিনি কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করেন। এ বছর ব্যবসা কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তিত।
খাবার হোটেলের একাধিক মালিক জানান, এ বছর আম না হওয়ায় তাদের খাবার হোটেলগুলো নিয়ে চিন্তিত রয়েছেন। তারা জানান, আম মৌসুমে তাদের হোটেলে বেচা বিক্রি বেশি হয়। ফলে পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা আসে।
‘আম ফাউন্ডেশন ভোলাহাটের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মোজাম্মেল হক চুটু বলেন, গত বছরের চেয়ে এ বছরে আমের উৎপাদন চার ভাগের এক ভাগ হবে। আমগাছে প্রচুর মুকুল এলেও বৃষ্টির কারণে মুকুল ঝরে যায়। ফলে আমগাছে গুঠি আসেনি। আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা ও আশঙ্কা বিরাজ করছে।
এ দিকে ভোলাহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বলেন, এ বছর আমগাছে প্রচুর মুকুল এসেছিল। কিন্তু গুঠি আসার সময় বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গুঠি আসতে পারেনি। গাছে গাছে শুধু নতুন পাতা গজিয়েছে। আম উৎপাদন কম হওয়ার কারণ হলো বৈরী আবহাওয়া। আমরা আমের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছি তা অর্জন সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ২৫ শতাংশ আম কম হতে পারে।



