মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় অবশেষে রিমান্ডে নেয়া হলো টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ, এসআই লিয়াকত ও নন্দদুলাল রক্ষিতকে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তাদের রিমান্ডে নেয় র্যাব। এ সময় ওসি প্রদীপকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে কারাগারের প্রধান ফটক দিয়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। র্যাবের গণমাধ্যম শাখার প্রধান লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ তাদেরকে রিমান্ডে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ‘সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত অনেকদূর এগিয়েছে। একে একে সব আসামির জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি তথ্য নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ দিকে কারাগার থেকে প্রদীপকে র্যাব হেফাজতে নিয়ে যাওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রদীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি বলে জানান তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম বিভাগীয় অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান। তিনি আরো জানান, ‘গতকাল ওসি প্রদীপকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা ছিল কিন্তু র্যাবের একটি দল প্রদীপসহ তিন জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়েছে। একইভাবে আমরাও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কারাগারে পৌঁছেছি। ওসি প্রদীপকে আমাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মতো পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ এ দিকে সিনহা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সোমবার রাতে গ্রেফতারকৃত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যকে সাত দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ রিমান্ডের আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাবের এএসপি খায়রুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত এপিবিএন সদস্য যথাক্রমে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শাহজাহান, কনস্টেবল রাজীব ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে আদালতে হাজির করে তাদের প্রত্যেকের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালতের বিচারক শুনানি শেষে প্রত্যেককে সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিনি আরো জানান এই তিন এপিবিএন সদস্য সিনহা হত্যাকাণ্ডের সময় শাপলাপুর চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে সোমবার রাতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার প্রধান বলেন, মেজর সিনহা হত্যা ঘটনার মূল সাক্ষী সিফাত এবং শিপ্রা দেবনাথের কম্পিউটার ডিভাইসসহ ২৯টি সামগ্রী কক্সবাজারের রামু থানায় পুলিশের হেফাজতে জিডি মূলে রক্ষিত আছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে আদালতের আদেশের মাধ্যমে ওই সব সামগ্রী র্যাব হেফাজতে নেয়া হচ্ছে।
প্রদীপসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা
কক্সবাজার (দক্ষিণ) সংবাদদাতা জানান, পাঁচ লাখ টাকা আদায় করে আরো পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ না দেয়ায় ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে টেকনাফের হ্নীলার সাদ্দাম হোসেন নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগ এনে মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যার মামলায় গ্রেফতার টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
গতকাল বিকেলে নিহত সাদ্দাম হোসেনের মা গুলচেহেরের দায়ের করা ফৌজদারি এজাহার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলা হিসেবে রুজু করেছেন। আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ফৌজদারি এজাহার আমলে নিয়ে তা তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। বাদি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইনসাফুর রহমান সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।
মামলায় হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমানকে প্রধান আসামি ও ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে ২নং আসামি করা হয়েছে। মোট ২৮ জন আসামির মধ্যে ২৭ জনই পুলিশের সদস্য। অন্যজন হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার নুরুল আমিন প্রকাশ নুরুল্লাহ।
এজাহারে বাদি অভিযোগ করেন, গত ৪ জুলাই টেকনাফ হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভীবাজার এলাকার মৃত সুলতান আহমদ প্রকাশ বাদশার ছেলে সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাই জাহেদ হোসেনকে বাড়ির অদূরে রাস্তায় আটক করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। তাদের ছাড়িয়ে আনতে ফাঁড়িতে যান বাদি (মা) গুলচেহের। কিন্তু তাদের ছেড়ে দিতে সম্মত হলেও ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমান। এক পর্যায়ে পাঁচ লাখ টাকায় উভয়ের মধ্যে দফারফা হয়। পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে একই দিন তিন লাখ টাকা সরাসরি হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমানের হাতে দেন বাদি গুলচেহের। বাকি দুই লাখ পরদিন মশিউর রহমানের কথা মতো তার পাঠানো বাহক ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার নুরুল আমিনকে দেন।
বাদি এজাহারে আরো জানান, মশিউর রহমান পাঁচ লাখ টাকা গ্রহণ করার পর দুই ভাইয়ের মধ্যে জাহেদ হোসেনকে একটি মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেয়। ৭ জুলাই রাত ১০টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে ৩০০ গজ দূরে এনে সাদ্দাম হোসেন ও অন্য একজনকে গুলি করে পুলিশ। এতে গুরুতর আহত হন সাদ্দাম হোসেন। পরে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাদি গুলচেহের এজাহারে দাবি করেন মশিউর রহমান, সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও মামলার তিন নং আসামি আরিফুর রহমানের পরামর্শ ও নির্দেশক্রমে অন্য আসামিরা যোগসাজশ করে সাদ্দাম হোসেনকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছেন। সাদ্দামকে মারার কিছু দিন পর তাদের বাবা সুলতান আহমদ প্রকাশ বাদশাকেও পুলিশ ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে একইভাবে হত্যা করেছে বলে বাদি এজাহারে উল্লেখ করেছেন।
কিছু দিনের ব্যবধানে স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বাদি গুলচেহের। অন্য দিকে এই বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করতে নিয়মিত হুমকি দিয়েছে পুলিশ। তাই মামলার আবেদন করতে দেরি হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করেন বাদি গুলচেহের।
মামলার অন্য আসামিরা হলোÑ হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মো: আরিফুর রহমান, এসআই সুজিত চন্দ্র দে, এসআই অরুন কুমার দে, এসআই মো: নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া, এসআই নাজিম উদ্দিন, এসআই কামরুজ্জামান, এএসআই আমির হোসেন, এএসআই কাজি সাইফুদ্দিন, এএসআই নাজিম উদ্দিন, এএসআই মাঈন উদ্দিন, এএসআই মাযহারুল ইসলাম, এএসআই নঈমুল হক, এএসআই মিশকাত উদ্দিন, এএসআই রাম চন্দ্র দাশ, সাগর দেব, রুবেল শর্মা, আবু হানিফ, মো: শরীফুল ইসলাম, মো: আজিজ, দ্বীন ইসলাম, মো: বোরহান, মো: জসিম উদ্দিন, আব্দুশ শুক্কুর, সেকান্দর, মহিউদ্দিন ও হ্নীলা ইউনিয়নের দফাদার নুরুল আমিন প্রকাশ নুরুল্লাহ।



