পুলিশের গুলিতে মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলার তিন সাক্ষীকে আরো চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও র্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ ওই রিমান্ড আদেশ দেন। রিমান্ড আদেশপ্রাপ্তরা হচ্ছেন, টেকনাফের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়ার নাজিম উদ্দিন নাজুর ছেলে নুরুল আমিন, নজির আহমদের ছেলে নিজাম উদ্দিন এবং জালাল আহমদের ছেলে মোহম্মদ আয়াছ। এরা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে তাদের নাম আসায় পরে তাদের গ্রেফতার করে এই মামলার আসামি করা হয়। এর আগে সোমবার মামলার প্রধান আসামি বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতসহ সাত পুলিশের আরো চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন একই আদালত। রিমান্ডের আদেশপ্রাপ্ত অপর আসামিরা হচ্ছেন, বহিষ্কৃত কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন ও এএসআই লিটন মিয়া। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম বলেন, সিনহা হত্যা মামলার তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অধিকতর তদন্তের স্বার্থে আসামিদের আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। এ দিকে সোমবার দুপুরে কক্সবাজার র্যাব কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক তোফায়েল মোস্তফা সারওয়ার জানিয়েছেন, রিমান্ডে আসামিদের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সব আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একটি ভালো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন বলেও জানান তিনি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এই হত্যাকাণ্ডে আসামিদের পৃথক এবং মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কথোপকথনের অডিও শোনানো হয়েছে। এসব জিজ্ঞাসাবাদ একটি ধারণা পরিষ্কার হয়েছে যে, সিনহা হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল। তা না হলে এক দুই মিনিটের মধ্যে গুলি করার প্রশ্নই আসে না। হত্যাকারীরা পূর্ব থেকেই সিনহাকে গুলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলেই কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তাকে গুলি করা হয়। মেজর (অব:) সিনহার পরিচয় নিশ্চিত হয়েই তাকে পরপর তিন রাউন্ড গুলি করেন টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী। এরপর মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও নন্দদুলাল রক্ষিতসহ কয়েকজন মিলে তার মুখ ও গলা টিপে ধরেন। সূত্র মতে, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী তার নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি না করে এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতের পিস্তল দিয়ে গুলি করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে নন্দদুলাল রক্ষিতের এমন দাবির সত্যতা যাচাই করতে ইতোমধ্যে সেই অস্ত্রটি র্যাব হেফাজতে নেয়া হয়েছে। একইসাথে আর্মড পুলিশের তিন সদস্যকে হেফাজতে নিয়ে প্রদীপ, লিয়াকত, নন্দদুলালসহ অপরাপর আসামিদের মুখোমুখি করা হয় বলে জানান হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম। সূত্র মতে, মামলার অন্যতম আসামি এবং পুলিশের বাদি হয়ে প্রথমে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নন্দদুলাল দাবি করেছেন, ইন্সপেক্টর লিয়াকত তার অস্ত্রটি নিয়েই সিনহার ওপর চারটি গুলি করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী যার জন্য অস্ত্র বরাদ্দ তিনি সেটা দিয়ে গুলি করতে পারেন। কিন্তু লিয়াকত কেন নিজের অস্ত্র ব্যবহার করলেন না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্যই একটাই আর তা হচ্ছে আমরা যেসব তথ্য পাচ্ছি, নিশ্চিত হতে সেগুলোকে মিলিয়ে নিচ্ছি যার মাধ্যমে সত্য বেরিয়ে আসে। প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মারিশবুনিয়া পাহাড়ে ভিডিওচিত্র ধারণ করে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার নীলিমা রিসোর্টে ফেরার পথে শাপলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ সময় পুলিশ সিনহার সাথে থাকা সিফাতকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। পরে রিসোর্ট থেকে শিপ্রাকে আটক করা হয়। তারা বর্তমানে জামিনে মুক্ত।