সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপকে গতকাল আরো এক দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া এই মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন প্রধান আসামি বরখাস্ত হওয়া পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও উপপরিদর্শক নন্দদুলাল রক্ষিত।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফের বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে গতকাল চতুর্থ দফায় আরো এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা ২টার দিকে র্যাবের একটি দল তাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (টেকনাফ-৩) আদালতে তোলেন। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাব-১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খায়রুল ইসলাম অধিকতর তথ্যের স্বার্থে আরো এক দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তামান্না ফারাহ এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে প্রদীপকে র্যাব হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রদীপকে জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল।
গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) একই আদালত প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক (বরখাস্ত) লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতের তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সিনহা হত্যার ঘটনার এক মাস পার হলো। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি মামলা হয়েছে।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী শেষে কারাগারে নন্দদুলাল : সিনহা হত্যা মামলায় বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিতকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী শেষে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর আগে তৃতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড শেষ হয় তার।
সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে গতকাল সোমবার নন্দদুলাল রক্ষিতকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতে তোলা হয়। দীর্ঘ প্রায় ৪ ঘণ্টা জবানবন্দী গ্রহণ শেষে বেলা সোয়া ৩টার দিকে কারাভ্যানে করে তাকে জেলা কারাগারে নেয়া হয়েছে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা র্যাবের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে রোববার (৩০ আগস্ট) মামলাটির প্রধান আসামি ও বরখাস্তকৃত পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী দোষ স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছেন। গত শুক্রবার তৃতীয় দফায় বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই লিয়াকত আলী, এএসআই নন্দদুলাল রক্ষিতের তৃতীয়বারের মতো তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত।
১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার জন্য বরখাস্ত এএসআই নন্দদুলাল রক্ষিতকে সোমবার কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে আনা হয়। গত ২৬ আগস্ট আলোচিত এই মামলায় ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন অন্যতম আসামি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য কনস্টেবল আব্দুল্লাহ। নন্দদুলাল রক্ষিতসহ মামলাটিতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়া আসামির সংখ্যা দাঁড়াবে তিনে।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রধান আসামি লিয়াকতের : মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) সিনহা হত্যা মামলার প্রধান আসামি বরখাস্তকৃত পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী আদালতে ১৬৪ ধারামতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। গত রোববার দুপুর পৌনে ১২টা থেকে বিকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতের খাস কামরায় জবানবন্দী দেন। পরে তাকে জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও র্যাব-১৫ কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘সিনহা হত্যা মামলার মূল আসামি র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক কিছু স্বীকার করেছেন। এ কারণে তাকে আদালতে আনা হয়েছে। আমি আশা করি, আসামি লিয়াকত সব সত্য আদালতের কাছেও স্বীকার করবে।’ এর আগে রোববার দুপুরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর লিয়াকত আলীকে সরাসরি আদালতে নিয়ে আসে র্যাবের একটি দল। গত শুক্রবার ওই মামলায় তৃতীয় দফায় বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী, এএসআই নন্দদুলাল রক্ষিতের তৃতীয়বারের মতো তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তৃতীয় দফায় তিনের রিমান্ড মঞ্জুরের এক দিন পরই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন লিয়াকত।
দোষীদের শাস্তি দাবিতে কক্সবাজারে মানববন্ধন : মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কক্সবাজারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গতকাল কক্সবাজারের নির্যাতিত জনগণসহ কয়েকটি মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ায় বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপসহ পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া পরিবারের সদস্য এবং ওসি প্রদীপসহ অন্যান্য পুলিশের নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা অংশ নেন। এতে বক্তব্য দেনÑ কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী, ওসি প্রদীপের হাতে নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফাসহ পুলিশের নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীরা এবং মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া মোবাইল ফোনে ঢাকা থেকে নিহত মেজর (অব:) সিনহা মো: রাশেদ খানের মায়ের দেয়া বক্তব্য মাইকে প্রচার করা হয়। তিনি দোষী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দাবি করেন।