একজন স্বপ্নচারী তরুণ উদ্যোক্তা তানভীর মাহমুদ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছেন। যেখানে লেখাপড়া করা বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে বিসিএস ক্যাডার অথবা প্রথম শ্রেণীর কোনো সরকারি কর্মকর্তা হওয়া। কিন্তু প্রচলিত ধারায় গা ভাসাননি তিনি। চাকরি বা ব্যবসার পেছনে না ছুটে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এক ফুলের নার্সারি। তার নার্সারিতে রয়েছে দেশী-বিদেশী শতাধিক প্রজাতির পদ্ম ও শাপলা ফুলসহ ৫০০ প্রজাতির দুর্লভ গাছ। নিজেদের ২৪ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন তার জলজ নার্সারি। নার্সারিতে ঢুকেই নানা প্রজাতির শাপলা আর পদ্মফুল দেখে যে কারো চোখ জুড়িয়ে যাবে। শাপলা আর পদ্মফুল যে বাহারি রঙের হতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। পড়াশোনা শেষে ফুলের ভালোবাসায় নিজের ভিটায় দিয়েছেন বাগান। বর্তমানে ৩০ লাখ টাকার দেশী-বিদেশী ফুলের সমাহার তার বাগানে। মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে যাত্রা শুরু তানভীরের।
কিশোর বয়সে বড় আকারের আন্তর্জাতিক মানের ফুলের বাগান করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ছোটবেলা থেকে বাড়ির চার পাশে মায়ের গড়ে তোলা বাহারি ফুলের বাগান দেখে বড় হন তিনি। ফুলের প্রতি প্রেম তাকে আগ্রহী করে তোলে। হরিরামপুর উপজেলার বলড়া ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের নিজ বাড়িতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করা তরুণ উদ্যোক্তা তানভীর আহমেদ গড়ে তুলেছেন তার এই বিশ্বমানের ফুল ও ফলের বাগান। এ বাগানে রয়েছে আমেরিকা, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ বিশ্বের ২৫টি দেশের পাঁচ শতাধিক পদ্ম, জলজ ফুল ও ফল গাছের সমারোহ। বাগানটিতে আছে এঞ্জেল ট্রাম্পেট, গ্লিরিসিডিয়া, কানাইডিংগা, ক্যানাঙ্গা, বিভিন্ন রঙের দোলনচাঁপা, ডম্বিয়া, স্থল পদ্ম, জল গোলাপ, নীল মণি, শ্বেত মণি, গোলাপি সহস্র বেলি, পার্সিয়ান জুঁই, সরস্বতী চাঁপা, ব্ল্যাক প্রিন্সেস, হাজার পাপড়ির ঞযড়ঁংধহফং ঢ়বঃধষং পদ্ম, আফ্রিকান বাওবাব, হলুদ শিমুল, রাজ অশোকসহ ৫০০ প্রজাতির দুর্লভ গাছ।
যার মধ্যে বিদেশী ১০৭ প্রজাতির শাপলা, ৫৬টি প্রজাতির পদ্ম, ২০টি অন্যান্য জলজ, শতাধিক প্রজাতির জবা, ৪০ প্রজাতির সুগন্ধি, ৫০ প্রজাতির লতানো, ৫০ প্রজাতির ফলগাছ, ২০ প্রজাতির ইন্ডোর, ২০ প্রজাতির বনজ ও বিদেশী আরো ৫০ প্রজাতির অন্যান্য গাছ। এ ছাড়া এই বন্যায় দেড় শতাধিক প্রজাতির জবা গাছ মারা গেছে এবং অর্ধশতাধিক দেশীয় গাছ রয়েছে তার বাগানে।
তানভীর আহমেদ বলেন, ফুল ও ফল গাছ অপরিসীম আনন্দ দেয় তাকে। তাই তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করেও চাকরির পেছনে না ছুটে জীবিকা নির্বাহে বেছে নিয়েছেন বাগান করার উদ্যোগ। তারই ধারাবাহিকতায় এই বাগানটিতে এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফুল ও ফল গাছের সমারোহ।
তানভীরের দাবিÑ তার বাগানে এমন কিছু গাছ আছে, যেগুলো তার হাত ধরেই এ দেশে প্রথম এসেছে এবং কিছু গাছের নামও তিনিই করেছেন। যেমন জল গোলাপ। গাছটি পানিতে হয়। ফুলটা খুব সুন্দর সাদা গোলাপের মতো। তাই তিনি বিদঘুটে ইংরেজি নাম না দিয়ে নাম রাখেন জল গোলাপ। এই নামেই এটি এখন দেশব্যাপী পরিচিত। এ ছাড়াও তার বাগানে ফোটে ব্ল্যাক প্রিন্সেস নামে গাঢ় খয়েরি শাপলা। সেটাও তার নিজের উদ্ভাবিত শাপলার একটা প্রজাতি। এ দিকে তার বাগানের মূল আকর্ষণ হাজার পাপড়ির ঞযড়ঁংধহফং ঢ়বঃধষং পদ্ম। বলা হয় ফুলটাতে ১ হাজার পাপড়ি থাকে।
তিনি ২০১৪ সাল থেকে ফুল গাছ উৎপাদন ও বিপণনের মতো কাজকে পেশা হিসেবে নেন। তার এই দৃষ্টিনন্দন বাগান দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসেন অনেক দর্শনার্থী। তানভীর তার ইুঁ ুড়ঁৎ ঢ়ষধহঃ ভৎড়স ঁং নামের ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে সারা দেশে এই ফুল ও গাছ বিক্রি করেন। মাত্র দুই বছরে বাণিজ্যিকভাবেও সফলতা পেয়েছেন তিনি। তানভীর শুধু ফুল বাগান করেই থেমে থাকেননি। পরাগায়ণের মাধ্যমে পদ্ম ও শাপলা ফুলের নানা প্রজাতিও উদ্ভাবন করছেন তিনি।
সুলতানপুর গ্রামের আব্দুল করিম, অতোয়ার রহমান ও শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, তানভীরের এমন বাগান সাধারণত দেখা যায় না। সে ফুল ও ফলের বাগানের গাছ বিক্রয়ও করে। উচ্চ শিক্ষিত এমন তরুণ উদ্যোক্তা পাওয়াও দুষ্কর।
এ বিষয়ে হরিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল গফফার জানান, হরিরামপুরে নার্সারি অনেক আছে, কিন্তু এ রকম ফুলের নার্সারি হরিরামপুরে নেই। তাই তিনি নিয়মিত এটির খোঁজখবর রাখেন। এই উদ্যোক্তাসহ অন্য কেউ যদি সহযোগিতা চান, তবে অবশ্যই তাকে সহযোগিতা করবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। এ ছাড়া একজন শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে তানভীরকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা তানভীর মাহমুদ আরো বলেন, ‘লেখাপড়া চলাকালেই দেখেছি পরিচিত জন এবং বন্ধু-বান্ধব চাকরির পেছনে অনেক সময় দিচ্ছেন। আবার অনেকে চাকরি পাওয়ার পরও ব্যক্তিগত জীবনে হ্যাপি না। কারণ চাকরির আলাদা একটা প্রেসার থাকে। ওই প্রেসারটা সবাই নিতে পারে না। তবে আমার শুরু থেকেই চিন্তা ছিল নিজে কিছু করব। এই তাগিদ থেকেই ফুলবাগান করা। এতে আমি অপরিসীম আনন্দ পাই।’ তিনি বন্ধুদের মাধ্যমে বীজ ও কন্দ, চারা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন, ভিয়েতনামসহ প্রায় ২৫টি দেশ থেকে সংগ্রহ করেছেন।