‘ও হুতরে হুত, তোরে করুনা তুন বাঁচাইবের লাই টেঁয়া হাডাই চীনে তুন লই আছি। করুনা তুন বাঁইচলেঅ পাষাণের তুন বাঁইচলিনা।’ এ আর্তি ফেনীর নিহত ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ইউনুছ নবী বাবুর মায়ের। ছেলের লাশ দেখে ফেনীর আঞ্চলিক ভাষায় মাতম করছিলেন রেজিয়া বেগম। তিনি বলেন, করোনা থেকে বাঁচাতে এক লাখ টাকা পাঠিয়ে ছেলেকে চীন থেকে দেশে ফিরে আনেন। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচালেও পাষ দের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারার আক্ষেপ এ হতভাগ্য মায়ের। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার রাতে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে যখন ইউনুছ বাবুর লাশ আসে তখন মা ও স্বজনদের আর্তনাদে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। মা রেজিয়া বেগমের বুক ফাটা আর্তনাদে চোখের পানি কেউ ধরে রাখতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘এত কষ্ট করি হুতেরে মানুষ কইরলাম। আঁর চাঁন সোন্দর হুত। পাষাণেরা কেন্নে মাইরলো। ও হুতরে হুত, আরে স লই যা।’ এত কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছি, আমার এত সুন্দর ছেলে কিভাবে পাষ রা খুন করল। তুই আমাকেও নিয়ে যা।
ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে বারবার আকুতি করলেও ভেতরে কালোপলিথিন ওপরে সাদা কফিনে মোড়ানো গলিত লাশ দেখতে পারেননি মা। শত শত মুসল্লির অংশগ্রহণে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ওই গ্রামের আবু ইউসুফের বড় ছেলে ইউনুছ বাবুকে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে বাবু ছিল সবার বড়। বাবা পেশায় রং মিস্ত্রি। বাবু ফেনীর আইসিএসটি থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী শেষে স্কলারশিপ পেয়ে চীনে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিল। করোনাকালীন দেশে এসে আর ফিরে যায়নি।
শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে পুলিশ শহরের পাঠানবাড়ী সড়কের তাসফিয়া ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে বাবুর লাশ উদ্ধার করে। একই ট্যাংক থেকে আগের দিন সকালে আহত অবস্থায় তার অপর বন্ধু শাহরিয়ারকেও উদ্ধার করা হয়। তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার ভোরে পাঠানবাড়ী সড়কের তাসফিয়া ভবনের নিচতলার গ্যারেজের কক্ষে কেয়ারটেকার মোজাম্মেল হক শাহীন পানি দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করছিলেন। তা দেখতে পান একজন ভাড়াটিয়া। ওই ভাড়াটিয়া তার ছেলেকে ডেকে বিষয়টি দেখান। তারা রক্ত কোথা থেকে এলো জানতে চাইলে মোজাম্মেল সদুত্তর দিতে পারছিলেন না। এ সময় তারা পাশের সেপটিক ট্যাংক থেকে মানুষের গোঙানির শব্দ পেয়ে এগিয়ে আসেন। তারা ট্যাংকের ঢাকনা তুলে মুমূর্ষু অবস্থায় শাহরিয়ারকে উদ্ধার করে থানায় খবর দেন। পুলিশ শাহরিয়ারকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। সেখান থেকে শাহরিয়ারকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওই ঘটনায় ভবনের কেয়ারটেকার মোজাম্মেল হক শাহীনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
অপর দিকে বাবু হত্যার ঘটনায় মা রেজিয়া বেগম বাদি হয়ে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় গ্রেফতার ভবন কেয়ারটেকার মোজাম্মেল হক শাহীনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। মামলার অপর আসামি ছাত্রলীগ নেতা রাকিবকে গ্রেফতারে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুদ্বীপ রায়।