চলছে অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহ। সময়ের ধারাবাহিকতায় বাংলার ঘরে আবার এসেছে নবান্ন। প্রকৃতির অনন্য রূপ ও ফসলের মাঠে কৃষকের হাসিতে বাংলার মানুষ বাঁধা পড়েছে হেমন্তের মায়া জালে। গ্রামের আদিগন্ত মাঠজুড়ে এখন হলুদে-সবুজে একাকার। নয়নাভিরাম অপরূপ প্রকৃতি। সোনালি ধানের প্রাচুর্য। তবে মানুষ ছাড়া প্রকৃতির বাকি অনুষঙ্গরা কি চলমান করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? মানুষের এ পৃথিবীর স্বত্বাধিকারী আরো অনেকেই আছে। যেমনÑ গাছ-পালা, পাখি, জীবজন্তু প্রভৃতি। প্রকৃতির সৌন্দর্য আজো অম্লান।
‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে/ অলস গেঁয়োর মতো এই খানে-কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার/ চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/ তাহার আস্বাদ পেয়ে পেকে উঠে ধান’। হেমন্তের আসল রূপের বর্ণনা মেলে প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দের কবিতায়।
প্রকৃতি রঙ বদলায় তার নিজস্ব নিয়মেই। প্রকৃতির পরতে পরতে কত বিচিত্র রঙ যে মিশে আছে! চোখ খুলে দেখলে, মনের গহিনে তা উপলব্ধি করলে প্রাণ যায় জুড়িয়ে। প্রকৃতি তাই বিশ্ব চরাচরে এক রহস্যের নাম। বিশেষ করে বাংলা ঋতুর বহু বিচিত্র রূপ-রস-গন্ধ মানুষকে মুগ্ধ করে। এক অভাবনীয় রূপবিভায় বাংলার ঋতু-প্রকৃতি প্রতিটি বাঙালিকে ভাবালুতায় নিমজ্জিত করে। অনাদিকাল থেকে চলে আসছে এ প্রক্রিয়া।
হেমন্তে প্রকৃতি ও মানুষের রূপবদল বড় অপূর্ব। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠজুড়ে হলুদ ধান আর ধান। দলে দলে মানুষ সেসব ধান কাটে, আঁটি বাঁধে আর সেসব আঁটি বাগের দু’পাশে দাড়িপাল্লার মতো ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফেরে। কোথাও বা সেসব ধানের আঁটি বোঝাই গরুর গাড়ি মেঠো পথে ক্যাচর ক্যাচর শব্দ তুলে গৃহস্থের বাড়ি বা ধানখোলার পথে চলে।
এখন ভোর থেকে হেমন্তের কুয়াশা নামে নেমেছে মাঠে। বিন্দু বিন্দু শিশির জমে আছে ধান গাছের বুড়ো পাতায়। ক্ষেতের ওপর ওড়াউড়ি করছে ফড়িংয়ের দল। সোনালি ধানের ক্ষেত ডিঙিয়ে পূর্ব দিগন্ত রাঙিয়ে উঠছে ভোরের সূর্য। হালকা শীত শীত ভোরের ভেতর মিষ্টি রোদের ওম, কী যে ভালো লাগে!
হেমন্তের শেষের দিকে গ্রামে আর একটি দৃশ্য চোখে পড়ে। গাছিরা কুয়াশা ভেঙে ধীর লয়ে হাঁটে, তরতর করে খেজুর গাছে ওঠে। ধারালো দা দিয়ে খেজুর গাছের মাথা চেঁছে রস নামানোর আয়োজন করে। হেমন্তের মাঝখান থেকেই শুরু হয় সেসব রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানানোর মহোৎসব। গাঁয়ের অনেক গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে বড় উনুন তৈরি করা হয়, তার ওপর তাপাল রেখে খেজুরের রস জ্বাল দেয়া হয়। রস জ্বালের ঘ্রাণে সারা গাঁ ম ম করে।
আবার হেমন্ত তো সেই মাছভাত খাওয়ারই ঋতু। দেশের অনেক বিল-ঝিল-হাওর-বাঁওড় এ সময় শুকাতে শুরু করে। সেসব শুকাতে থাকা জলাশয়ে ধরা পড়ে মাছ। অনেক মানুষ মাছ ধরতে নেমে পড়ে বিলে-ডোবায়। নানা রকম দেশী মাছে বাজার তেঁতে ওঠে। আইড়, বোয়াল, চিতল, বাগাড়, পুঁটি, ট্যাংরাÑ কত রকমের মাছ যে ধরা পড়ে। হাওর-বাঁওড়-বিলে তাই রচিত হয় দলে দলে ধান কাটার পাশাপাশি মাছ ধরাও। মাছ ধরা শেষে ডুলাভর্তি মাছ নিয়ে বীরবেশে ঘরে ফেরে মানুষ। কৃষাণীর রান্নাঘর থেকে তাজা মাছ ভাজার ম ম গন্ধ চার দিকে জানান দেয়, ‘আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে...।’ এ ছাড়া হেমন্তে নানা উৎসব-পার্বণে গ্রাম-বাংলার জীবন মুখরিত থাকে। থাকে আনন্দময়।
এখন অনেক শীতসবজিও উঠতে শুরু করেছে। আগাম বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালংশাক, মুলাÑ কী নেই হেমন্তের বাজারে? একদিকে কৃষক ধান কেটে গোলায় তোলে, অন্য দিকে চৈতালি বা রবি ফসল বোনার কাজ শুরু করে। লাখ লাখ কৃষক-কৃষাণীর জীবনে যেন নেমে আসে এক অনাবিল পার্বণের আনন্দ, নতুন ধানে হয় নবান্নের উৎসব। এককথায়, মহাব্যস্ততায় কাটে হেমন্ত কৃষকের দিনগুলো।
হেমন্ত আসে, হেমন্ত যায়। হেমন্ত মানেই আমরা এখন অনেকেই ভাবি নবান্নের ঋতু। কিন্তু হেমন্ত যে এক বহুরূপী প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ এক ঋতু, সে কথা ভুলে যাই। খানিকটা ঠাণ্ডা, খানিকটা গরম, অনেকটাই নাতিশীতোষ্ণÑ এরকম এক আবহাওয়ার ঋতু হেমন্ত। কখনো ঝড়-মেঘ, কখনো কুয়াশা। সবুজ ধানক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে সোনারঙে বদলে যাওয়া। অতিথি পাখিদের আগমন শুরু। গাঁয়ে গাঁয়ে খেজুর গুড় আর পিঠের ঘ্রাণ। ঝকমকে তাজা মাছে সাজানো জেলেদের ডালা। এই তো আমাদের অনেক রূপের হেমন্তের প্রকৃতি আর সে প্রকৃতির আশ্রয়ে আমরা একটু অন্যরকম হই বাংলার মানুষগুলো। কিন্তু ভয় হয়, যেভাবে পৃথিবীর জলবায়ু বদলাচ্ছে তাতে আগামীতে আমরা আমাদের এই আপন হেমন্তকে খুঁজে পাব তো?
শরতের শুভ্রতা শেষের হেমন্ত বাংলার জীবনকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে। আশ্বিন-কার্তিক দুই মাস হেমন্তকাল। স্থায়িত্ব মাত্র দুই মাস, কিন্তু এর প্রভাব অসীম। মায়াময় প্রকৃতির মধ্যে মানুষ যেন তার জীবনকেই খুঁজে ফেরে। খুঁজে পায়। এই ঋতুতে মানুষের আসে প্রেম, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, অভিলাষ এক ভিন্নমাত্রা পায়। হেমন্ত বাংলার মানুষের মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলে ভাব, প্রকৃতিপ্রেম, বাঙালিয়ানা আর নিরন্তর সৃজনশীল কর্মকাণ্ড।
শিশির ভেজা দুর্বা ঘাস মাড়িয়ে প্রকৃতির মধ্যে হেমন্তের প্রবেশ সৃজনশীল মানুষের মন ও হৃদয়কে নানাভাবে চাঙ্গা করে, উজ্জীবিত করে। সহজিয়া মনের অলিন্দে অলিন্দে খেলা করে নিত্যনতুন সৃষ্টি। গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, নাটক, যাত্রাপালা, বৈঠকী গান, পুতুলনাচ, জারি-সারি, বাউল গান, কবির লড়াইÑ সবকিছুতেই হেমন্ত এনে দেয় নতুন এক মাত্রা।
দেশের অন্যতম প্রধান নারী কবি সুফিয়া কামাল ‘হেমন্ত’ কবিতায় লিখেছেন, সবুজ পাতার খামের ভেতর/হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন পাথারের ওপার থেকে আনল ডেকে হেমন্তকে?
হেমন্তের অপার সৌন্দর্য মানুষের মনকে নানা রঙে রাঙিয়ে তোলে এই সৌন্দর্যপ্রেমিক হৃদয়কে মাতোয়ারা করে দিয়ে তার মনোলোকে সৃষ্টি করে আশ্চর্য এক জগৎ, যেখানে জীবন ও মানুষই হয়ে ওঠে মূল শক্তি। কবি জীবনানন্দ দাশ তার বিখ্যাত কবিতা ‘আবার আসিব ফিরে’তে অসাধারণভাবে হেমন্তের ছবি এঁকেছেন, তীব্র ভালোবাসার উচ্চারণ করেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়, হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে/হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়’, তখন মন অজানা ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।



