কক্সবাজার জেলা কারাগারে মোহাম্মদ মোস্তফা (২৫) নামে এক হাজতির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যায় ওই বন্দী হার্ট অ্যাটাক এবং পরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে কারা কর্তৃপক্ষের দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তার মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র মতে, কারা কর্তৃপক্ষ ওই বন্দীর লাশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর হার্ট অ্যাটাকে আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার করেন। কিন্তু চিকিৎসকে শারীরিক পর্যবেক্ষণ এবং সুরতহাল রিপোর্টের সময় বন্দীর গলায় দাগ ও জিহ্বা বের হওয়ার বিষয় শনাক্ত হলে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়। কক্সবাজার জেল সুপার মোহাম্মদ নেছার আলম জানান, ওই বন্দী আত্মহত্যা করে থাকতে পারে তবে কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে তা বের করার জন্য দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মোস্তফার বাড়ি কক্সবাজার সদর উপজেলায়। একটি মারামারিতে কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান আজাদকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি ছিলেন মোস্তফা। ওই মামলায় গত রোববার আদালত তার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত সোমবার সন্ধ্যায় কারাগারের ভেতরে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মুনীরুল গীয়াস জানান, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘটনায় ডেপুটি জেলার সাইদুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ইন্সপেক্টর মামুনুর রশীদ ও হিসাবরক্ষক খন্দকার আজাদুর রহমান। কমিটিকে দুই কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জেল সুপার আরো জানান কারা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: শামীম রাসেলকে প্রধান করে আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা যায়, মারা যাওয়া হাজতি মোস্তফা কক্সবাজার সদরের ইসলামাবাদ ইউনিয়নের হরিপুর এলাকার বশির আহমেদের ছেলে। তবে তারা এলাকায় ‘রোহিঙ্গা’ বলে পরিচিত।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার নেছার আহমেদ জানান, মারামারি ও হত্যাচেষ্টার মামলায় গত ১৮ নভেম্বর মোস্তফা কারাগারে আসেন। এ মামলায় ২৯ নভেম্বর রিমান্ড শুনানি ছিল। আদালত তাকে একদিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেন। আদালত থেকে তাকে কারাগারে আনার পর তার কক্ষেই পাঠিয়ে দেয়া হয়। ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তাকে পেয়ে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক হাজতি মোস্তফাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শাহীন আবদুর রহমান জানান, মোস্তফা নামের এক বন্দীকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা যান। তার গলায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার নেছার আহমেদ বলেন, ‘আমি ছুটিতে গ্রামের বাড়ি। এরপরও যেহেতু কারাগারে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করার মতো কোনো দ্রব্য পাওয়ার কথা নয়, সেহেতু বন্দী মোস্তফার মৃত্যুর বিষয়টি তদন্তে পৃথক দু’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি জেলার ইন্সপেক্টরকে নিয়ে, তারা বৃহস্পতিবারের (৩ ডিসেম্বর) মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবেন। আরেকটি কমিটি করা হয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসককে প্রধান করে। তিনিও একই সময়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন।’
গত ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় কক্সবাজার সদরের ইসলামাবাদ হরিপুর এলাকার একটি সালিশ থেকে উঠে বাড়ি ফেরার পথে অতর্কিত আক্রমণের শিকার হন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান আজাদ লুতু। তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। কোপ থেকে মাথা রক্ষা করতে গিয়ে তার হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন প্রায়। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন। তাকে কোপানোর ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ঘটনার পরই রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত মোস্তফাকে স্থানীয়রা ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দেয়। এর পর থেকে কারাগারের নিয়ন্ত্রণে তিনি চিকিৎসা নেন। সুস্থ হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।