রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরকে মিয়ানমারের চেয়েও নিরাপদ জায়গা উল্লেখ করে এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, কক্সবাজারের যে জায়গায় এখন তারা রয়েছে তাতে যেকোনো সময় ভূমিধসের কারণে লক্ষাধিক মানুষ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। সামাজিক, শারীরিক ও অবকাঠামোগতসহ সব দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য এখন ভাসানচর তাদের নিজ দেশের থেকেও নিরাপদ যেখানে তারা ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর : সুবিধা এবং প্রতিকূলতা’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশের জন্য ওই সেমিনারের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ। গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (সিএফআইএসএস) চেয়ারম্যান কমোডর এম এন আবসার। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন, গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো: তৌহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
সেমিনারের শুরুতেই সিএফআইএসএসের সহায়তায় করা গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এ গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভাসানচরের সামাজিক ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করা। তথ্য-উপাত্ত, ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতামত বিশ্লেষণপূর্বক এ গবেষণা মনে করে যে, ভাসানচর একটি নতুন দ্বীপ হিসেবে পুরোপুরি বসবাসযোগ্য। এ দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলো যেমন আধুনিক বাসস্থান, রাস্তা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং বাঁধ দ্বীপটিকে টেকসই করেছে। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে এ দ্বীপটি ডুবে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া কৃষিকাজ, সবজি চাষ, মাছ শিকারসহ এখানে আরো জীবন-জীবিকার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্ম-কর্ম পালন ও বিনোদনের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা। দুর্যোগ হলে নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক আশ্রয়কেন্দ্র। তিনি বলেন, কক্সবাজারের সুযোগ-সুবিধাগুলো অপর্যাপ্ত এবং এর জন্য দায়ী হিসেবে দেখা গেছে অপ্রতুল বাসস্থান ও চিকিৎসা সুবিধা, অপ্রতুল আয়-রোজগারের ব্যবস্থা এবং রান্নাবান্না ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঘাটতি ইত্যাদি। শিশুদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা বেশ অপর্যাপ্ত হিসেবে দেখা গেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পুরো ক্যাম্পের এলাকাজুড়ে সমানভাবে নেই। ভাসানচরকে নিরাপদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাসানচর বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ একটি জায়গা। ভাসানচর দ্বীপটিকে আরো টেকসই করে তোলার লক্ষ্যে গবেষণার কিছু সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, ভূতত্ত্ববিদ এবং দুর্যোগ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা সুপেয় পানির যথাযথ ব্যবহারের প্রতি নজর দেয়ার কথা বলেছেন।
সেমিনারে অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, জিওলজিক্যালি এ আইল্যান্ডটি স্ট্যাবল। এখন শর্ত হলো ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি হলে কী হবে? এখন যেখানে ভাসানচর আছে তার আশপাশে অর্থাৎ ১৭৬২ সালে একটি ভূমিকম্প হয়েছে আরাকানে। সে ভূমিকম্পে এ অঞ্চলের বহু আইল্যান্ড তলিয়ে গেছে এখন ভাসানচরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে কি না? এটা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫০০-৯০০ বছর পর আবার হয়তোবা একটা ভূমিকম্প হতে পারে, সে ক্ষেত্রে আমাদের হাতে এখনো ২৫০ বছরের বেশি সময় আছে। তিনি আরো বলেন, আরেকটি বিষয় হলো ঘূর্ণিঝড়। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে ঘূর্ণিঝড়ের পথ নিয়ে স্টাডি করে দেখেছি ঠিক দ্বীপটির ওপর দিয়ে কোনো ঘূর্ণিঝড়ের পথ যায়নি, আছে দ্বীপটির দুই পাশে। তিনি ভাসানচরকে রোহিঙ্গাদের জন্য নিজ দেশের চেয়েও নিরাপদ জায়গা উল্লেখ করে বলেন, ২০১৭-১৮ সালের ইউএনএইচসিআর ও আমার বিভাগ একটি গবেষণা করেছিল তাতে দেখা যায় যে, রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে যেসব জায়গায় রয়েছে তাতে যেকোনো সময় পাহাড়ধস ও ভূমিধসের কারণে লক্ষাধিক মানুষ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশ্বে এমন ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্প আছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয় না। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর এ অঞ্চলের সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে জটিল করে তুলছে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম বলেন, কক্সবাজার দেশের একটি বড় ট্যুরিস্ট সিটি। সেখানে রোহিঙ্গাদের আগমনের ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের এ প্রকল্পকে আমরা পদ্মা সেতুর সাথে তুলনা করতে পারি। কারণ বাংলাদেশ এটি নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করেছে।