জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হবে আগামী সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এর মধ্যেই নতুন কমিটির দাবি উঠেছে সংগঠনটির ভেতরে। এ নিয়ে পদপত্যাশীরাও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। বিগত কয়েকটি দলীয় কর্মসূচিতেও পদপ্রত্যাশীদের দেখা গেছে নিজ বলয়ে আলাদা আলাদা শোডাউন করতে।
দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে ফজলুর রহমান খোকন ও ইকবাল হোসেন শ্যামল। তাদের নেতৃত্বেই হয় ৬০ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি। পৌনে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেননি তারা। এ ছাড়া কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে শুরু করেছে।
সব অভিযোগ ও ব্যর্থতা থেকে ছাত্রদলকে মুক্তি দিতেই নতুন কমিটি চাচ্ছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও নীতিনির্ধারকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বর্তমানে পদপ্রত্যাশী একাধিক নেতা বলেন, বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আগের সভাপতি ও সম্পাদক রাজীব-আকরামের মতো নিজের পদ দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টার কারণেই দলীয় কর্মকাণ্ড গতিশীল করার বদলে ধীরগতিতে নিয়ে গেছে। ফলে ২১ মাস পেরিয়ে গেলেও বর্তমান নেতৃত্ব কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়। ৬০ সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়েই চলছে কেন্দ্র।
বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি গঠনে ব্যর্থতা : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সারা দেশে ছাত্রদলের যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতাদের খুঁজে বের করতে ১১টি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়। এই টিমের কাজ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে যোগ্য নেতৃত্ব সুপারিশ করা। এরপর কেন্দ্র তার অনুমোদন দেবে। তবে রাজধানীকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চাঙ্গা হলেও গত ২১ মাসে রাজধানীর কোনো ইউনিট কমিটি গঠন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় কমিটি। তবে রাজীব-আকরামের কমিটির মেয়াদে গঠন হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটিটি শুধু পূর্ণাঙ্গ করা হয়েছে। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কলেজ কমিটিও গঠন করা হয়নি।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটির সদস্যদের নিয়ে গত সপ্তাহে বর্ধিত সভা হয়েছে। সভায় একাধিক জুনিয়র সদস্য ঢাকার কমিটিগুলো গঠন করার বিষয়টি উত্থাপন করেন। রাজধানীকেন্দ্রিক সব কমিটির কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। কিন্তু সভাপতি- সেক্রেটারি বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
ছাত্রদলের সহ-দফতর সম্পাদক আজিজুল হক সোহেল জানিয়েছেন, সারা দেশে উপজেলা, থানা ও পৌরসভায় মোট ১৩৩১টি কমিটি সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকার মধ্যে ঢাবি ছাড়া সব কমিটি বাকি আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে অনেক আগে। ঢাকার কলেজগুলোর কমিটির সুপারিশ জমা হয়েছে। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কারণে কমিটিগুলো অনুমোদন হয়নি।
কমার্শিয়াল সংগঠনে পরিণত : বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রদলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উৎকাচের বিনিময়ে বাছবিচার ছাড়াই কমিটি গঠন করার। এ ক্ষেত্রে সংগঠনের দুই শীর্ষনেতা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভাগবাটোয়ারা করেই নানা পদে লোক বসাচ্ছেন তারা। এতে অযোগ্যরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারলেও ত্যাগীরা উপেক্ষিত হচ্ছেন। কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের সুপারিশও মানছেন না খোকন-শ্যামলরা। অভিযোগ উঠেছে, ২৩ লাখ টাকা গ্রহণের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একজনকে উপজেলা ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল। পরে ২১ সদস্যবিশিষ্ট ওই কমিটির ১৩ জনের পদত্যাগ ও আন্দোলনের মুখে তারেক রহমানের নির্দেশে ওই কমিটি স্থগিত করা হয়।
নেই চূড়ান্ত গঠনতন্ত্র : ছাত্রদলের বয়স অর্ধশত বছর; কিন্তু দেশের বৃহৎ এই ছাত্রসংগঠনের নেই কোনো চূড়ান্ত গঠনতন্ত্র। দীর্ঘ সময় ধরেই খসড়া দিয়েই চলছে সংগঠন। জানা গেছে, বর্তমান কমিটির অন্যতম একটি দায়িত্ব ছিল গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা; কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসেও গঠনতন্ত্র নিয়ে তারা কোনো কাজই করেননি। গঠনতন্ত্র ছাড়াই একটি সংগঠন বছরের পর বছর চলছে। ছাত্রদলের সহ-দফতর সম্পাদক আজিজুল হক সোহেল জানিয়েছেন, আমাদের গঠতন্ত্র এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই কিছু সংশোধন এনে চূড়ান্ত করা হবে।
নতুন কমিটিতে যাদের নিয়ে আলোচনা : নতুন কমিটি গঠনের সম্ভাবনার মধ্যে যারা দায়িত্বে আসতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আমিনুর রহমান আমিন, যুগ্ম সম্পাদক শাহ নেওয়াজ, মাইনুদ্দিন রাজু, রিয়াদ ইকবাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মো: রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাইফ মাহমুদ জুয়েল। সোগান মাস্টার হিসেবে পরিচিত এ নেতা দলের দুর্দিনে হাইকমান্ডের নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে তৃণমূলের আস্থার জায়গায় রয়েছেন। দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অবস্থান আর ঝুঁকি নেয়ার কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীর মধ্যে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। এ ছাড়াও কমিটি গঠনে তার সততার সুনাম রয়েছে দলের হাইকমান্ডের কাছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়ে একাধিকবার ফোন ও এসএমএস দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামলের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।



