কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদীতে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভাঙনের কবলে পড়েছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের অন্তর্গত পদ্মা পাড়ের হাজারো পরিবার, ফসলি জমি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সড়ক-মহাসড়ক। এছাড়া হুমকিতে রয়েছে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরি ঘাটগুলো।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে ভয়াবহ নদীভাঙনের ক্ষত কাটতে না কাটতেই আবারো ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। এ কারণে পদ্মা পাড়ের মানুষগুলো নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে লঞ্চঘাটের ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে বুধবার থেকে বালু ভর্তি জিওটিউব ব্যাগ ফেলা শুরু করেছে। কিন্তু ঘাটের উজানে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে নেয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। এতে করে বিক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়েছেন এলাকার লোকজন। এ অবস্থায় গত বুধবার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: মোস্তফা মুন্সি। এ সময় তিনি এ এলাকার ভাঙন প্রতিরোধে এক সপ্তাহের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারো ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে এ অঞ্চল। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে পদ্মা পাড়ের শত শত মানুষ। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সি পাড়া, কাওয়াজানি ও মধ্য কাওয়াজানি এলাকা এবং দৌলতদিয়া ইউনিয়নের সাত্তার ফকির পাড়া, ছিদ্দিক কাজীর পাড়া, মজিদ শেখের পাড়া, ১নং ব্যাপারী পাড়া, সাহাজদ্দিন ব্যাপারী পাড়া, লালু মণ্ডল পাড়া ও নতুন পাড়া।
এছাড়া ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাটগুলো। ৭টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১, ২, ৩ ও ৭ নং ফেরিঘাট এলাকায় অনেক জিও ব্যাগ ধসে গেছে। জরুরি ব্যবস্থা নেয়া না হলে তীব্র স্রোতে ঘাটগুলোতে বড় ধরনের ধস সৃষ্টি হয়ে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু জিও ব্যাগ সঙ্কটের কারণে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বেশ দীর্ঘদিন ধরে জরুরি সংরক্ষণের কাজ করতে পারছে না।
দেবগ্রাম ইউনিয়নের মজিদ সরদার পাড়ার বাসিন্দা নিকাত সরদার (৭০),রহিমা বেগম (৬৫),সরিফা খাতুন (৪৫),মরিয়ম বেগম (৪০) বলেন, গত কয়েক বছরে তাদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমরা যারা আছি এবার হয়তো থাকতে পারবো না। কিন্তু ঘরবাড়ি সরিয়ে কোথায় গিয়ে যে আশ্রয় নেব সে নিশ্চয়তাও নেই। দৌলতদিয়া ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার বাবু মোল্লা জানান, তারা কয়েক শ’ পরিবার ১ ও ২ নং ফেরিঘাট এলাকায় বসবাস করেন। ঘাট দুটির বিভিন্ন স্থানে জিও ব্যাগ ধসে গেছে। আরেকটু পানি ও স্রোত বাড়লে এখানকার ঘাট দুটিসহ গোটা এলাকা ভেঙে যেতে পারে। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষকে বলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: মোস্তফা মুন্সি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। অথচ দৌলতদিয়া ও দেবগ্রামের ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ভাঙনের কারণে গোয়ালন্দের মানচিত্র থেকে ইউনিয়ন দুটি হারিয়ে যেতে বসেছে। ভাঙন প্রতিরোধের জন্য আমরা পানিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়েছি। সরকারের একাধিক মন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় এ এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। কিন্তু অদ্যাবধি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অঞ্চলের সহকারী প্রকৌশলী মো: শাহ আলম জানান, ফেরিঘাটগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। আশা করছি শুক্রবার সকাল থেকে কাজ শুরু করতে পারবো। রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী আ: আহাদ বলেন, আমরা জরুরি ভিত্তিতে লঞ্চঘাট রক্ষায় কাজ শুরু করেছি। এর বাইরের এলাকায় আমাদের কাজ করার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে জরুরি প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে কাজ করা হবে।