‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে।
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে।’
জাতীয় কবির এমন কথামালা শরতের সৌন্দর্যের এক মূর্তমান বহিঃপ্রকাশ। শরৎ এলেই কালের ধারায় প্রকৃতি জগৎ হেসে ওঠে প্রাণের সজীবতায়। রঙ, রূপ ও স্নিগ্ধতা নিয়েই হাজির হয় ঋতুরানী শরৎ।
ঝকঝকে নির্মল নীল আকাশের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে গুচ্ছ গুচ্ছ শুভ্র মেঘমালা। মনে হয় শ্বেত বসনা একঝাঁক তরুণী যেন নৃত্য করছে। নিচে বিস্তীর্ণ জলরাশিতে নীলাকাশের প্রতিচ্ছবি। মৃদু জলের ঢেউয়ে পাগলা হাওয়ার মাতামাতি। বৃষ্টি শেষে আবারো রোদ। দিগন্তজুড়ে একে সাতরঙা উদ্ভাসে ফুটে ওঠে রঙধনু। কাঠফাটা রোদ্দুরের পর হঠাৎ বৃষ্টি। শরতের আকাশ কখনো ধোয়া-মোছা, পরিচ্ছন্ন হয় না। সে তার নীলচে বুকে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আবরণকে ঢেকে রাখতে চায়। এক কথায় স্বচ্ছ, নির্মল এক ঋতুর নাম শরৎ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ফলফুল আর নদীনালা, খাল-বিলকেন্দ্রিক এক জনপদ মানিকগঞ্জ। প্রকৃৃতির অপার এই সৌন্দর্যের হাতছানিতে অনেকেই অবলোকন করতে আসেন এখানে। ভাদ্র মাসের আছে আর মাত্র এক দিন। গতকাল মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কালীগঙ্গা নদীর ধার ধরে এগোতেই চোখে পড়ল আকাশ-জলে এক মোহনীয় মায়াবী দৃশ্য। বাতাসের সাথে সন্ধি করে মৃদু ধ্বনি তোলা নদীতে চলছে কয়েকটি পাল তোলা ছোট নৌকা। শরতের নিজস্বতা কাশফুলের সাথে দেখা মিলল। পরিমাণে অল্প হলেও বাতাসে দোল খাওয়া সাদা সাদা কাশফুলে যেন হারিয়ে যায় মন। জাবরা এলাকায় নদী পাড়ি দিয়ে গবাদি পশুর ঘাস কেটে নেয়ার সময় এক কৃষকের দরাজ গলায় গাওয়া গানও শোনা গেল। স্থানীয়রা জানালেন, কমতে শুরু করেছে নদনদীর পানি, হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই নদীর ধারে সাদা হয়ে যাবে কাশফুলে। এ সময় বিভিন্ন ফুলের শোভা আর শস্যের শ্যামলতায় প্রকৃতি থাকে ভরপুর।
এরপর বিকেলে ঘিওরের বালিয়াখোড়া ও পেঁচারকান্দা এলাকার বিস্তৃীর্ণ আবাদি জমির চকে দেখা গেল কিশোর-কিশোরীদের শাপলা তোলার দৃশ্য। অনেকেই নৌকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শাপলা শালুক আর নীল জলের ছবিতে ধারণ করছেন নিজেদের ছবি। যেন এক উৎসব আমেজ। কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল, নয়াজলে ফসলের জলকেলিতে যেন মিলনমেলা বসেছে কীটপতঙ্গের। ছোট ছোট পাখিদের বেপরোয়া দাপাদাপি ও মিষ্টি কলতান। থেমে নেই শৌখিন মাছ শিকারিরা। মেঘের আনাগোনা আর কখনো রোদের ঝিলিক; শরতের স্নিগ্ধ বিকেলের এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য কেবল গ্রামবাংলায়ই সম্ভব।
উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের বাষ্টিয়া, সিংজুরী চক, নিলুয়া বিলের চক, বানিয়াজুরী ইউনিয়নের রাথুরা চকে যেন পদ্ম-শাপলা-শালুকের মেলা বসেছে। আচ্ছন্ন জলাভূমিতে শাপলা শালুকের প্রতিবিম্ব শরতের চিরকালীন রূপ। রাথুরা চকে নৌকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সব বয়সী মানুষ। তুলছে শাপলা। তুলছে ছবি। মুহূর্তে আপলোড হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কথা হয় গৃহবধূ লতা খানম, ফিরোজা আক্তারের সাথে। সন্তানদের নিয়ে বিকেলে নৌকায় ঘুরতে বেরিয়েছেন। তারা জানালেন, শতব্যস্ততার পরও এ সময়টা খুব উপভোগ করি। ছেলেমেয়েরাও খুব আনন্দ পায়।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা তানিয়া আফরোজ বলেন, শরৎ মানেই গাছে গাছে শিউলি ফোটার দিন। নদীর পাড়ে কিংবা জলার ধারে ফোটে কাশফুল। শাপলা, কামিনী, হাসনাহেনা, ছাতিম, জারুলে অসাধারণ রূপ-গন্ধ মোহিত করে সবাইকে। এ ঋতু অনেক প্রিয়।
মানিকগঞ্জ জেলা পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক লক্ষ্মী চ্যাটার্জ্জী বলেন, শরৎ মানেই নদীর তীরে কাশফুল, গাছে গাছে শিউলি, বেলি, জুঁই, শেফালী, মালতি, টগর, হাসনাহেনা আর বিলে-ঝিলে শাপলা ফুলের সমারোহ; লম্বা লম্বা তালগাছে পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ। সেই তাল দিয়ে তৈরি করা পিঠা। আর ক্ষেতে ক্ষেতে আমন ধানের বেড়ে ওঠা চারা। শরৎ ঋতুর সৌন্দর্যের বাংলার প্রকৃতিকে করে তোলে রূপময় ও মোহনীয়।
শরতের বিকেলটাও শান্তস্নিগ্ধ, মিষ্টি আমেজের। তার চেয়েও বেশি আবেশি শরতের জোৎস্না রাত। বিস্তীর্ণ স্বচ্ছ জলরাশির ওপর ভেসে বেড়ানো ডিঙ্গি নৌকা; উপরে নীলাকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। স্বচ্ছ স্থির পানিতে সেই চাঁদের প্রতিবিম্ব। চার দিকে শুধু জোৎস্না আর জোৎস্নার মেলা। যেন হাত বাড়ালেই ধরা যাচ্ছে।
শরতের এ সময়ে নদী ও বিস্তীর্ণ জলরাশির বিলে অনুষ্ঠিত হয় গ্রামবাংলার আদি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ। মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলায় কমপক্ষে অর্ধশত স্থানে এই নৌকাবাইচে মানুষের মিলনমেলা বসে। বাংলাদেশের কবিতা, গান, গল্প, সাহিত্যে শরৎ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শরতের এই রূপ দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রকৃতির কাছে যেতে হবে।



