ডাকসু’র সাবেক জিএস ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর মৃত্যুর পর থেকেই জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের আসনে থাকা দলটির গুরুত্বপূর্ণ ওই পদে নিয়োগ নিয়ে শুরু হয় লবিং-তদবির। মহাসচিব পদের জন্য সাবেক দুই মহাসচিবসহ বেশ কয়েকজন তোড়জোড় শুরু করেন। তবে, সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার ও মসিউর রহমান রাঙ্গা আগের পদে যাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকেন। এর বাইরে এই পদে আলোচনায় আসেন গাইবান্ধা থেকে নির্বাচিত অতিরিক্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি। জাতীয় পার্টির একটি সূত্র বলছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মহাসচিব পদে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা দেয়া আছে পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে। শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মহাসচিব নিয়োগে জি এম কাদের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন, এমন খবরে তার নিয়োগ ঠেকাতে একাট্টা হয়েছেন সিনিয়র নেতাদের বড় অংশ। তাদের অনুসারীরাও এ নিয়ে ক্ষুব্ধ।

করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু গত শনিবার মারা যান। এর পর থেকেই কে হচ্ছেন মহাসচিব তা নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা ও তোড়জোড় শুরু হয়। মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আলোচনায় উঠে আসে বেশ কয়েকজনের নাম। তাদের মধ্যে মসিউর রহমান রাঙ্গা, রুহুল আমিন হাওলাদার, মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সাহিদুর রহমান টেপা, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও মীর আব্দুস সবুর আসুদ অন্যতম। এর মধ্যে মশিউর রহমান রাঙ্গা ও ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ক্ষমতাসীন দলের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। জিয়াউদ্দিন বাবলুর আগে মসিউর রহমান রাঙ্গা মহাসচিব ছিলেন।

তারও আগে দীর্ঘ দিন মহাসচিব ছিলেন রুহুল আমিন হাওলাদার। মহাসচিব হতে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব সাহিদুর রহমান টেপা ও তার অনুসারীরাও চেষ্টায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। আলোচনায় আছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চেয়ারম্যানের বিশেষ উপদেষ্টা মীর আব্দুস সবুর আসুদও। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর থেবেই তার সাথে রাজনীতিতে আছেন তিনি। দীর্ঘ দিন তিনি ছিলেন জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথেও। জাপা সূত্র জানায়, বাবলুর মৃত্যুর পর থেকেই নতুন মহাসচিব নিয়ে দলটির ভিতরে গ্রুপিং-লবিং শুরু হয়। বিচ্ছিন্নভাবে দফায় দফায় বৈঠকে বসছেন শীর্ষনেতারা। জাপার একটি সূত্র জানায়, পার্টির একটি অংশ দলে অপেক্ষাকৃত নবীন ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মহাসচিব করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এতে বাদ সেধেছেন পার্টির বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা। তারা বলছেন, রাজপথের আন্দোলনে শামীম হায়দার পাটোয়ারীর কোনো অবদান নেই। দলের সুদিনে এসে এমপি হয়ে গেছেন। জাতীয় পার্টিতে অনেক ত্যাগী ও সিনিয়র নেতা রয়েছেন।

জাপার আরেকটি সূত্র জানায়, গত সোমবার দুপুরে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মহাসচিব পদে নিয়োগ দেয়ার চিঠিতে স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল। সংবাদটি পার্টির নেতাদের কানে পৌঁছালে তাৎক্ষণিক ফুঁসে ওঠেন দলটির সিনিয়র নেতারা। জাতীয় পার্টিতে মহাসচিব পদ প্রত্যাশী অনেক সিনিয়র নেতা থাকলেও শামীম হায়দার পাটোয়ারীর মতো একজন জুনিয়রকে মহাসচিব পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে মানতে নারাজ তারা।

মহাসচিব পদে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে ঠেকাতে এবং সিনিয়র যে কাউকে পার্টির মহাসচিব বানাতে সোমবার বিকেলে রাজধানীর কলাবাগানে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন সিনিয়র নেতারা। বৈঠকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশিদ এমপি, মসিউর রহমান রাঙ্গা, মজিবুল হক চুন্নু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, অতিরিক্ত মহাসচিব সাহিদুর রহমান টেপা, প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু, উপদেষ্টা জহিরুল আলম রুবেল উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্র জানায়।

জরুরি এ বৈঠকে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে কোনো অবস্থায়ই যেন পার্টি মহাসচিব না বানানো হয়, সে বিষয়ে সবাই ঐকমত্য পোষণ করেন। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শামীম পাটোয়ারীকে মহাসচিব করা হলে রংপুরের কোনো নেতাকর্মী মেনে নেবে না। বৃহত্তর রংপুরের তাকে অবাঞ্ছিত করারও ঘোষণা দেন সাবেক এক মহাসচিব। এই পদটি হেভিওয়েট উল্লেখ করে বৈঠকে এক কো-চেয়ারম্যান বলেন, শামীম পাটোয়ারীকে মহাসচিব করা হলে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির জন্য পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের দায়ী থাকবেন।

এ বিষয়ে পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি বলেন, পাটোয়ারীর কোনো অবদান নেই দলে। শ্রম দিয়েছি, রক্ত দিয়েছি, জেল খেটেছি। আজকে একটি বাচ্চা ছেলে, দুই দিন হয়নাই দলে এসেছে তাকে আমাদের মহাসচিব মানতে হবে? জুনিয়র লেভেল থেকে মহাসচিব করা হলে যাদের পার্টিতে ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে তারা হবে। আমরা চাই গ্রহণযোগ্য যেকোনো সিনিয়র নেতা পার্টির মহাসচিব হোক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপার প্রধান উপদেষ্টা সিএমএইচে ভর্তি আছেন। আইসিইউ থেকে তাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। আগের চেয়ে তিনি এখন অনেকটাই ভালো। জাপার আরেকটি সূত্র জানায়, মহাসচিব পদ নিয়ে যদি সুষ্ঠু কোনো সমাধানে না আসতে পারে দলটি, সে ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দিয়েও কিছুদিন পার্টি চালাতে পারে। রওশন এরশাদের পরামর্শ নিয়ে শেষ পর্যন্ত পার্টির গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ দিতে পারেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। প্রেসিডিয়ামের এক সদস্যের ভাষ্য, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যেভাবে একক সিদ্ধান্তে মহাসচিব নিয়োগ দিতেন, সে ক্ষেত্রে জি এম কাদেরকে পার্টির সিনিয়রদের সাথে কথা না বলে বা সমঝোতা ছাড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা দুরূহই হবে। এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদেরকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।