বাংলাদেশ এখন পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেকর্ড প্রায় ৩২ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। এরপরও কেন বাড়ছে পেঁয়াজের দাম? প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আসাদুল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, পেঁয়াজ উৎপাদন এ বছর বেশি হয়েছে, এটা ঠিক। মার্কেটিংয়ে একটু প্রবলেম হয়েছে। বাজারে পেঁয়াজ যথেষ্ট আছে। সিন্ডিকেট বা যেকোনো কারণে দাম বেশি নিতে পারে। তবে আরেকটি জিনিস মনে রাখতে হবে, এই অক্টোবর মাসে মুড়িকাটা পেঁয়াজ (আস্ত পেঁয়াজ) লাগাচ্ছে কৃষক। এটা ডিসেম্বর শেষ বা জানুয়ারিতে উঠবে। এই পেঁয়াজ লাগাতে (বীজ হিসেবে ব্যবহার) প্রয়োজন হয় এক লাখ টনের উপরে। দাম বৃদ্ধির এটা একটা কারণ।

পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকা ছুঁয়েছে জানালে তিনি বলেন, ৮০ না, আমি আজ সকালে কিনেছি ৭০ টাকা কেজি।
পেঁয়াজ বাজারে অ্যাবেইল অ্যাবল আছে। তবে যেকোনো কারণে দাম ৫-১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা সত্য। আমরা মনে করি উৎপাদন ঠিক আছে। গ্রীষ্মকালীন এই সময়ে সঙ্কট একটু থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত বছর এই সময় পেঁয়াজ নিয়ে মিটিংয়ের পর মিটিং করেছি। এবার তো এখনো মিটিং করা লাগেনি। আর আমরা এবার কৃষককে ১৮ মেট্রিক টন বীজ ও চারা কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে দিয়েছি। এটা আগামী ডিসেম্বরে উঠবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ডিজি বলেন, ১৮ হাজার কৃষককে এক বিঘা সমপরিমাণ জমির জন্য এই বীজ ও চারা দেয়া হয়েছে। বিঘায় দুই টন করে ফলন হলেও ৩৬ হাজার টন আসবে। এটা বাজারে ভূমিকা রাখবে। আর বাইরে থেকেও পেঁয়াজ আসছে। প্রায় দুই লাখ টন পেঁয়াজ চলে এসেছে। পেঁয়াজের কিছুটা সঙ্কট দুই মাস, নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু বাজারে পেঁয়াজ আছে, আর সঙ্কট হবে না।

জানা যায়, বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা অস্থিরতা নতুন নয়। ভারত হঠাৎ পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় ২০১৯ সালে ৩০০ টাকা কেজিতেও পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে। মূলত সেপ্টেম্বর-নভেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল থাকে। কারণ দেশে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন কম। দেশে ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজ দরকার পড়লেও উৎপাদন হতো ২৫ লাখ টনের কিছুটা বেশি। তবে, বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন এক লাফে ৩২ লাখ টনে পৌঁছেছে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে পেঁয়াজ উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় স্থানটিও বাংলাদেশের দখলে চলে এসেছে। আগে ৩০ লাখ টনের কিছুটা বেশি উৎপাদনে এই অবস্থানে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন (দুই কোটি টন) ও ভারত (৮১ লাখ টনের বেশি)।

পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর, তথা চার বছর মেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করে কৃষি বিভাগ। বাংলাদেশে মূলত রবি মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়ে থাকে; কিন্তু সঙ্কটটা দেখা দেয় গ্রীষ্মকালে। তাই পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য রবি মৌসুমে উন্নতজাতের মাধ্যমে আবাদের পরিধি বাড়ানোসহ গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনেও গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। কৃষককে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বীজ/চারা এবং সার দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক বলাই কৃষ্ণ হাজরা বলেন, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আমাদের জাতের নাম বারি-৫। এর মাদার জাত হচ্ছে ভারতের এন-৫৩। ভারত থেকে ১৮ মেট্রিক টন এই উন্নতজাতের বীজ আনা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং গবেষকরা এই বীজের চারা তৈরি করছেন। এই চারা কৃষকদের মাঝে বণ্টন করা হবে। এ জন্য তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই বীজের ফলন ভালো। হেক্টর-প্রতি প্রায় ২০ টন উৎপাদন হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে (গ্রীষ্মকাল) দেশের ১৮ জেলার ১৮ হাজার কৃষককে ১৮ হাজার বিঘা (একজনকে এক বিঘা) জমি চাষের জন্য গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ/চারা (এলাকা ব্যসিসে) প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয়েছে। সাথে ২০ কেজি ডিএফসি সার ও ২০ কেজি এমপি সার দেয়া হয়েছে। চারা লাগানো থেকে ৬০ দিন পর এই পেঁয়াজ পাওয়া যাবে। এরমধ্যে রাজশাহী অঞ্চলে পাঁচ হাজার কৃষক, বগুড়া অঞ্চলে এক হাজার কৃষক, রংপুর অঞ্চলে এক হাজার ৩০০ কৃষক, যশোর অঞ্চলে চয় হাজার ২০০ কৃষক, দিনাজপুর অঞ্চলে চার হাজার ২০০ কৃষক এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩০০ কৃষক এই প্রণোদনা পেয়েছেন। এর বাইরেও ৩৬৬ প্রতিষ্ঠানের (কৃষি সম্প্রসারণ, হর্টিকালচার, বিএডিসিসহ) জায়গায় গ্রীষ্মকালীন এই পেঁয়াজ রোপণ করা হয়েছে।

জানা যায়, ভিত্তি বছর হিসেবে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে রবি মৌসুমে পেঁয়াজ চাষের জমি ছিল দুই লাখ ৩৭ হাজার হেক্টরের কিছুটা বেশি। প্রথম বছর ১২ হাজার হেক্টর বাড়ানোর টার্গেট নেয়া হয় এবং খরিপ মৌসুমের ভিত্তি হিসেবে চার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রথম বছর ১৪ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এভাবেই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে দুই লাখ ৭৫ হাজার হাজার হেক্টর জমিতে (রবি ও খরিপ মৌসুম মিলে) পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে পেঁয়াজের ঘাটতি ১০ লাখ টন থেকে কমিয়ে দুই লাখ ৩৫ হাজার টনে নামিয়ে আনার কথা বলা হলেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক বলেন, ঘাটতি নয়, যেভাবে উৎপাদন বাড়ছে এর মধ্যে দেশ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। বিদেশ থেকে আর আমদানি করতে হবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজের রেকর্ড উৎপাদন হলেও এখনো ঘাটতি আছে। মূলত গ্রীষ্মকালেই এই সঙ্কট দেখা দেয়। তবে, যেভাবে উৎপাদন বাড়ছে, আগামী এক-দুই বছরের মধ্যেই পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে দেশ। তখন আর বাজার অস্থিতিশীল থাকবে না।