মন উচাটন করা ফসলের মাঠে শীতকালীন সবজির গন্ধ ভাসে। দুই পাশে অবারিত শস্যক্ষেতের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে মেঠো পথ। গ্রামের কাছাকাছি পথের ধারে বট গাছটি দীর্ঘদিনের রূপ-বৈচিত্র্যের সাক্ষী। সুশীতল ছায়ার নিরিবিলি পরিবেশে জিড়িয়ে নেন পথচারীরা। সেখানে গেলে চোখে পড়বে চিরায়ত গ্রাম, গ্রামের সহজ সরল মানুষের জীবনযাত্রা। উপভোগ করার জন্য বেশ উপযুক্ত স্থান। গাঁয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে যমুনার শাখা নদীর ক্ষীণকায় জলধারায় হাঁসের জলকেলি খেলা, পাখিদের কোলাহল আর সাঁঝের বেলায় ঝিঁঝি পোকার স্বপ্নীল ওড়াউড়ি। নদী ছাড়াও পরম মমতায় খাল-বিল ঘিরে রেখেছে গ্রামটিকে। গ্রামের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের প্রধান অনুসঙ্গ এসব জলাশয়।
‘ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-ঝরা ঘাসে
সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।’
পল্লী কবির এই কবিতার মতোই জীবন্ত হয়ে উঠা এক গ্রামের নাম বিষ্ণুপুর। মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার খলসী ইউনিয়নে অবস্থিত এই গ্রামটি যেন প্রকৃতির নিজস্ব সাজে সজ্জিত। সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা এক জনপদ। ৪টি পাড়ায় ৬ শতাধিক লোকের বাস এ গাঁয়ে। বেশির ভাগ মানুষের প্রধান জীবিকা নদীর মাছ ধরা, ক্ষেতের শস্যাদি, টাটকা সবজি আর গবাদিপশু পালন।
কিন্তু সময়ের সাথে বদলে যাচ্ছে চিরচেনা এই রূপরেখা। প্রবাসে এবং শহরে চাকরি করেন অনেকে। আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে তাদের। গ্রামের প্রায় সব শিশু-কিশোর এখন শিক্ষার আওতায় এসেছে। অজপাড়াগাঁয়ের বেশির ভাগ বাড়িতে এখন বৈদ্যুতিক আলো, ইন্টারনেট, টেলিভিশন। দেশ-বিদেশের খবরাখবর রাখা এখন তাদের কাছে অনেকটা সহজতর। তবে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ভ্রমণ পিপাসুদের অনাগ্রহ দেখা দেয়। এখনো সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পাখ-পাখালির ডাক শোনা যায় গ্রামটিতে।
গতকাল সোমবার সরেজমিন ঘিওরের কুস্তা এলাকা দিয়ে দৌলতপুর উপজেলার খলসী ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামে যাবার পথে দেখা গেল গাঁয়ের আঁকা বাঁকা মেঠো পথ, নদীর পাড় আর ক্ষেতের আইল ধরে যাতায়াত করছে মানুষজন। খেটে খাওয়া মানুষগুলো ভীষণ কর্মচঞ্চল। মোটরসাইকেলের আওয়াজে শিশুরা এখনো দৌড়ে আসে রাস্তার ধারে। সরলতামাখা গৃহবধূরাও বাড়ির পুরুষদের সাথে কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত। অতিথিপরায়ণ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে কুশল বিনিময় শেষে জানতে চান দেশ বিদেশের খবরাখবর।
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি সাইজুদ্দিন মিয়া বলেন, আমাদের গাঁয়ের মানুষের মধ্যে অনেক মিল। ঝগড়াঝাটি হয় না বললেই চলে। যেকোনো সমস্যা আমরা গ্রামের মুরুব্বিরা বসে সমাধান করে থাকি।
জজকোর্টের আইনজীবী সহকারী আব্দুল মান্নান স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, ফেলে আসা আমার শৈশব, কৈশোরের সেই দিনগুলো আমাকে বার বার আকর্ষণ করে। অনেক বছর শহরে কাটানোর পরও একটু সময় পেলেই আমি ছুটে যাই আমার গ্রাম আমার মা আর আমার মাটি ও মাটির মানুষের কাছে।
খলসী ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মো: জিয়াউর রহমান বলেন, আমাদের পুরো ইউনিয়নটাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এর মধ্যে বিষ্ণুপুর গ্রামটি সত্যিই নয়নাভিরাম। এ গাঁয়ে প্রবেশ করলে যে কারোরই মনটা সজীবতায় ভরে উঠবে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা খারাপ। এ গ্রামের রাস্তাঘাট উন্নয়নে দ্রুত কাজ করা হবে।



