বান্দরবানে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর হামলা চালিয়েছে পার্বত্য সংগঠন জেএসএসের (মূল দল) সন্ত্রাসীরা। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক সেনাকর্মকর্তা নিহত হন। পরে সেনাসদস্যদের চালানো পাল্টা গুলিতে জেএসএসের তিন দুর্বৃত্ত মারা যায়। গুলিবিনিময়ে আরো এক সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সীমান্তের রুমা উপজেলার বোথিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে একটি এসএমজি, তিনটি দেশীয় অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গুলি, সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত পোশাকসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত সেনাকর্মকর্তার নাম মো: হাবিবুর রহমান। তিনি রুমা জোন (২৮ বীর) রাইক্ষিয়াংলেক আর্মি ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। আহত সেনাসদস্য মো: ফিরোজকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ দিকে নিহত সন্ত্রাসীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া না গেলেও কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে তারা হলো বিলাইছড়ির জয় চাকমা, বরকলের ঝিলিক চাকমা ও রুমার নিয়াংক্ষ্যং পাড়ার চমংপ্রু মারমা। বিকেলে তাদের লাশ রুমা থানা পুলিশকে হস্তান্তরের পর ময়নাতদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতাল মর্গে নেয়া হয়।
গতকাল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
জানা গেছে, রাইক্ষিয়াং লেক সেনাক্যাম্প থেকে একটি টহল দল বুধবার সন্ধ্যায় বের হওয়ার পর বোথিপাড়া এলাকায় পৌঁছলে সেখানে সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় উভয় পক্ষে গুলিবিনিময়ের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন জ্যেষ্ঠ ওয়ারেন্ট অফিসার মো: হাবিবুর রহমান। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয় তিন সন্ত্রাসী। পায়ে গুলি লেগে আহত হয় সৈনিক মো: ফিরোজ। পরে ওই স্থান থেকে অস্ত্র-গুলিসহ সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহৃত পোশাকসহ বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় সন্ত্রাসীদের ধরতে সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি দল অভিযান শুরু করেছে বলে সেনাকর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) মূল দলের সদস্য। পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেয়ার শর্ত থাকলেও জেএসএস সেই শর্ত ভঙ্গ করে চুক্তির পরবর্তী সময় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী লালন করছে। অথচ জেএসএস সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ ও চুক্তি বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ করে আসছেন। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি আঞ্চলিক দল হত্যা, গুম, চাঁদাবাজিসহ দুষ্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এ দিকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত জনসংহতি সমিতির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে হামলা : সেনাক্যাম্পের জ্যেষ্ঠ ওয়ারেন্ট অফিসার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেনা আনসারসহ ১৫ সদস্যের একটি দল নিয়মিত টহলে বের হয়। পরে তারা খবর পান বোথিপাড়া এলাকায় সন্ত্রাসীরা অবস্থান করছে। সেখানে টহলদল গেলে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত টহল দলের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান হাবিবুর রহমান। এ ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনীর সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে তিন সন্ত্রাসী নিহত ও বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। সেনাসদস্যদের গুলির মুখে ১৫-২০ জনের সন্ত্রাসী দল সেখান থেকে পিছু হটে। হামলাকারী দলটি ছিল পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মূল গ্রুপের। ওই গ্রুপটি দীর্ঘদিন থেকে ওই এলাকায় অবস্থান করছিল বলে জানা গেছে।
নিহত কর্মকর্তার লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন : পটুয়াখালী জেলা সদরের চাউন বউর এলাকার বাসিন্দা নিহত জ্যেষ্ঠ ওয়ারেন্ট অফিসার হাবিবুর রহমান। তার ছোট ভাইও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তার লাশ হেলিকপ্টারে বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে বিকেলে সেনানিবাসে প্রথম দফা নামাজে জানাজা শেষে তার লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
এ দিকে আইএসপিআর জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় জেএসএসপন্থী সন্ত্রাসীদের একটি দল রুমা উপজেলার বোথিপাড়া এলাকায় চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে আসবে এমন তথ্যের ভিত্তিতে রাইং খিয়াং লেক আর্মি ক্যাম্প থেকে সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাবিবের নেতৃত্বে একটি নিরাপত্তা টহল দল ওই এলাকায় যায়। টহল দলটি বোথিপাড়া এলাকায় পৌঁছালে নিকটস্থ একটি জুম ঘর থেকে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত টহল দলের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। সেনাটহল দলটির দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং সাহসী পাল্টা হামলায় জেএসএস মূল দলের তিন সশস্ত্র সন্ত্রাসী বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হওয়ার আলামত পাওয়া যায়। এ সময় পলায়নপর সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে টহল কমান্ডার হাবিবুর রহমান ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন এবং সৈনিক ফিরোজ ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। হতাহত সেনাসদস্যদেরকে বৃহস্পতিবার সকালে রুমা থেকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে হেলিকপ্টারে করে স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়া ওই অভিযানে সেনাটহল দল কর্তৃক সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত ১টি এসএমজি, ২৭৫ রাউন্ড তাজা গুলি, ৩টি এমোনিশন ম্যাগজিন, ৩টি গাদা বন্দুক, গাদা বন্দুকের ৫ রাউন্ড গুলি, ৪ জোড়া ইউনিফর্ম এবং চাঁদাবাজির নগদ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা জব্দ করা হয়।