মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের কালবৈশাখীর ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের সুতারপাড়া ও খাকশ্রী গ্রাম। গত সোমবার গভীর রাতে ওই ঝড়ে গ্রাম দু’টির দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়েছে। ভেঙে ও উপড়ে পড়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক গাছপালা। বসতঘর হারিয়ে অনেকে এখন খোলা আকাশের নিচে রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা জানান, সোমবার দিবাগত রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে গ্রাম দু’টি ও এর আশপাশের এলাকায় প্রবল বেগে কালবৈশাখীর ঝড় আঘাত হানে। এই ঝড় রাত ১২টা এক-দুই মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের এই ঝড়ে আহত হয় ৩০ থেকে ৪০টি গবাদি পশু। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আধাপাকা ধানসহ অন্যান্য ফসলেরও।
এ ছাড়া ঝড়ের তীব্রতায় বালিখোলা ফেরিঘাটের প্ল্যাটফরম সরে যাওয়ায় এ এলাকার ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে করিমগঞ্জের সাথে মিঠামইন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সুতারপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গরিব লোকজনের কাঁচা টিনের ঘরবাড়িগুলো মাটির সাথে মিশে পড়ে রয়েছে। অনেকের ঘরের টিনের চাল খোলা হাওরে এক-দুই কিলোমিটার দূরে পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঝড়ে। লোকজনকে উড়ে যাওয়া সেই সব ঢেউটিন ও এমনকি আসবাবপত্র হাওর থেকে সংগ্রহ করতে দেখা যায়। সুতারপাড়া গ্রামের মতিলাল বর্মণ ও বিষখা বর্মণ দম্পতির বসতঘরটি ঝড়ের সময় ভেঙে পড়ে।
এ সময় তারা দু’জনই ঘরের নিচে চাপা পড়েন। স্থানীয়রা ঝড়ের পরে বিধ্বস্ত ঘরের নিচ থেকে আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করেন। মতিলাল বলেন, আমরা গরিব মানুষ। রাত থেকে খোলা আকাশের নিচে আছি। এখন কিভাবে ঘর তৈরি করব। কোথায় যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
গ্রামের রহিমা আক্তার জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঘরের টিনের চাল উড়ে যায়।
গ্রামের বীরেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ, ববিতা বর্মণ, কুসুমবালা বর্মণ, রহিমা আক্তার, মোস্তফা, জহিরুল সবাই ঝড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের সবারই একাধিক ঘর ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। তারা বলছে, তাদের এই সামর্থ্য নেই যে, এখনই একটি ঘর উঠাবেন। তাই দ্রুত সরকার পক্ষ থেকে তাদের জন্য যেন কিছু একটা করা হয়।
খবর পেয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ, সুতারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো: কামাল হোসেন ভূঁইয়া, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা স্বপন মাতুব্বর ঝড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেন। এ সময় প্রাণিসম্পদ দফতরের কর্মীদের আহত গবাদিপশুগুলোকে চিকিৎসা দিতে দেখা যায়।
সুতারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো: কামাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ঝড়ে গরিব অভাবী লোকজনের কাঁচা বাড়িঘরগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টর্নেডোর পর থেকে অনেক মানুষ খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। এখন জরুরি খাবারের পাশাপাশি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
করিমগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) স্বপন মাতুব্বর বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এগুলো আমরা দ্রুত জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়ে দেবো।
এ দিকে বালিখোলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় যানবাহনের লম্বা লাইন। ফেরি চলছে না। এই এলাকা দিয়ে ইটনা মিঠামইন ও অষ্টগ্রামসহ হাওরের মানুষ চলাচল করেন। রাতের ঝড়ে চংনোয়াগাঁও ফেরিঘাটের প্ল্যাটফরম সরে যাওয়ায় দুরবস্থায় পড়েছেন তারা। স্থানীয়রা জানায়, ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় বিস্তীর্ণ হাওরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাওর থেকে সদ্যকাটা ধান পারাপার করা যাচ্ছে না।
তবে ফেরি সংশ্লিষ্ট লোকজন জানায়, প্ল্যাটফরমটি আগের জায়গায় স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হয়তো আজ বুধবার থেকে আবার সড়ক যোগাযোগ চালু হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, তালিকা পেলে আমরা দ্রুত এগুলো ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেবো। আর তাৎক্ষণিক সহায়তার প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসন সে ব্যবস্থাও নেবে। আমি নিজেও ঝড়ে বিধ্বস্ত এলাকাটি পরিদর্শনে যাচ্ছি।