আগামী বছরের শেষে কিংবা ২০২৪ সালের শুরুতে হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় বাকি থাকলেও এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন দলীয় সরকারের অধীনে কখনোই নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ইতোমধ্যে যেসব নির্বাচন হয়েছে তার কোনোটাই নিরপেক্ষ হয়নি। সম্প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকার রিপোর্ট প্রমাণ করে বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে তা সুষ্ঠু হবে না। একই সাথে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। অন্য দিকে সরকারি দলের নেতারা বলছেন, বিএনপি শুধু ঘরে বসে সমালোচনা করতে পারে। তারা সমালোচনা বন্ধ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সক্ষমতা প্রমাণে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন।
আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতাদের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনীতিতে বেশ আলোচনা ও উত্তাপ চলছে। জোটের বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগ আবারো অতীতের মতো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়। কিন্তু এবার অন্তত সেই পরিস্থিতি নেই বলে তাদের ধারণা। কেননা ইতোমধ্যে র্যাবের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি, বিদেশে টাকা পাচার, গণতন্ত্রহীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনকে ইচ্ছেমতো পরিচালিত করাসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের কারণে দেশে-বিদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের ইমেজ এখন তলানিতে। সেই সাথে জাতিসঙ্ঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নয়ন সহযোগী প্রভাবশালী দেশগুলো আগামী নির্বাচনের দিকে নজর রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।
গত শনিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের এক অনুষ্ঠানে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, পৃথিবীর অন্য গণতান্ত্রিক দেশের মতোই বাংলাদেশে সময়মতো নির্বাচন হবে। সমালোচনা বাদ দিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও সংবিধান মেনে সেভাবে নির্বাচন হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে দায়িত্ব পালন করবে নির্বাচন কমিশন। তাদেরকে সরকার শুধু সহায়তা করবে। আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন সবকিছুই থাকবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। সরকারের অধীনে কিছুই থাকবে না। ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সমালোচনা না করে আসুন নির্বাচনে লড়াই করি। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কোনো লাভ নেই। ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশ ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশনের দিকে যাচ্ছে।
অন্য দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও মানবাধিকার রিপোর্টগুলো প্রমাণ করে বর্তমান সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। কেননা আন্তর্জাতিক বিশ্ব এসব বিষয় নিয়ে অনেক আগে থেকেই কাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক নেতাকর্মীদের হয়রানি, গুম, খুনের ব্যাপারে তারা দীর্ঘ দিন ধরে বলে আসছে। বাংলাদেশে নির্বাচন হবে কি হবে না; এটা নির্ভর করবে পরিবেশ তৈরি হচ্ছে কি না তার ওপর।
‘দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, শক্তিশালী বিরোধী দল আছে বলেই তো আমরা কথাগুলো বলে আসছি। আসলে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। সেটি তাদেরই কারচুপির কারণে। একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে তিনি কোন ধরনের শক্তিশালী বিরোধী দল দেখতে চাচ্ছেন সেটি আমরা ঠিক বুঝি না। তবে তিনি যেটা দেখতে চাচ্ছেন সেটি দেখতে পাবেন খুব শিগগিরই। তিনি আরো বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়ার মতো প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তবে আমরা চাই সেই নির্বাচনটা হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এই মুহূর্তে আমাদের একমাত্র চাওয়া হচ্ছে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। শুধু বিএনপি নয়, দেশের প্রতিটি মানুষ তা চায়। সে লক্ষ্যে আমরা বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছি। সরকার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এখন সবারই মূল লক্ষ্য হচ্ছে অবাধ সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচন। বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা বারবার প্রমাণ করেছেন ভোটের নামে জনগণ তথা ভোটারদের সাথে তারা প্রতারণা করেছেন। তিনি বলেন, যেকোনো মুহূর্তে ডাক আসবে। সাথে সাথে রাজপথে নেমে পড়তে হবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে বিদায় করতে হলে বর্তমান বাস্তবতায় অভিন্ন কর্মসূচিতে যুগপৎ আন্দোলন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মতো চার-পাঁচটি মঞ্চ হতে পারে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে না এবং সরকার এই দাবি সহসাই মেনে নেবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই শিগগিরই কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকারের বিদায় হবে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে আসবেন এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে। তিনি বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন সরকারের সাথে ফয়সালা হবে রাজপথে। খুব শিগগিরই তিনি ডাক দেবেন। এই ডাকে যেসব নেতা মাঠে নামবেন তারাই আগামী দিনে মূল্যায়িত হবেন।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ড. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিল বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের মানবাধিকার, ভোটাধিকার হরণ করে সুষ্ঠু ভোটের নামে জনগণের সাথে বারবার প্রতারণা করছে। এবার তাদেরকে সেই সুযোগ দেয়া হবে না।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বাম জোটের সমন্বয়ক সাইফুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ওবায়দুল কাদের যা বলেছেন তা তিনি নিজেও বিশ্বাস করেন না। এভাবে বারবার সুষ্ঠু ভোটের কথা বলে তারা দেশের গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে তাদের দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এমতাবস্থায় দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে কেউ বিশ্বাস করে না।
নির্বাচন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তপ্ত রাজনীতি
ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন হবে : কাদের; দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব : ফখরুল
আগামী বছরের শেষে কিংবা ২০২৪ সালের শুরুতে হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় বাকি থাকলেও এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে...



