একটি-দুটি নয়, অন্তত ৩৪ মামলার আসামি তিনি। ঋণ জালিয়াতি, বিদেশে টাকা পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে বহুল আলোচিত এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদারের (পিকে হালদার) বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় এসব মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া পিকে হালদার গত শনিবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোক নগরের একটি বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) পি কে হালদার ও তার পাঁচ সহযোগীকে গ্রেফতার করে।
পিকে হালদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর চার মাস পর প্রথম মামলা দায়ের করে দুদক। ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন দুদকের উপপরিচালক মো: সালাউদ্দিন। পরবর্তী সময়ে দুদকের আরেক উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে একটি টিম আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। ওই টিম বিগত দুই বছরে পিকে হালদার ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৪টি মামলা দায়ের করে। এছাড়া অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার চার্জশিট ২০২১ সালের নভেম্বরে দাখিল করা হয়। যেখানে ৪২৬ কোটি টাকার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় ছয় হাজার ৮০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগে পিকে হালদারসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে দুদক।
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৩৪ মামলার মধ্যে তিনটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বাকিগুলো তদন্তাধীন। এসব মামলার তদন্তকালে এখন পর্যন্ত ১২ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী, পিকে হালদারের সহযোগী শংখ বেপারী, রাশেদুল হক, অবন্তিকা বড়াল ও নাহিদা রুনাইসহ ১০ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এ ছাড়া এক হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের সম্পদ অবরুদ্ধ ও জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে আদালতের মাধ্যমে ৬৪ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। একই ইস্যুতে ৩৩ ব্যক্তির সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন সময়মতো জমা না দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়।
যেসব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ঋণ উত্তোলন : পি কে হালদার ও তার সহযোগীরা একের পর এক কাগুজে প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ঋণ তুলতেন। পরে বিভিন্ন কৌশলে সেই টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করতেন। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, নিউট্রিক্যাল লিমিটেড, এস এ এন্টারপ্রাইজ, সুখাদা প্রপার্টিজ লিমিটেড, নেচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, উইনটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বর্ণ, সন্দ্বীপ করপোরেশন, আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অ্যান্ডবি ট্রেডিং, আরবি এন্টারপ্রাইজ, দেয়া শিপিং লিমিটেড, ইমার এন্টারপ্রাইজ, জি অ্যান্ড জি এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, মেরিনট্রাস্ট লিমিটেড, মুন এন্টারপ্রাইজ, এমটিবি মেরিন লিমিটেড, ও পি অ্যান্ড এল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। এ ছাড়াও আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ তুলে তা আত্মসাৎ করেন পি কে হালদার।
২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে যখন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের গ্রাহকরা অর্থ ফিরে পেতে অভিযোগ করতে থাকেন তখনই দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়। একাধিক কর্মকর্তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে পি কে হালদারের আর্থিক দুর্নীতির নানা তথ্য। একই সাথে তার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও। আত্মসাতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা ও নিজস্ব বাহিনীকে কাজে লাগিয়েছেন পিকে হালদার চক্র।
দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুসারে পি কে হালদার ও তার সঙ্গীরা মিলে অন্তত ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যা বিভিন্ন উপায়ে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। অনুসন্ধানের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পি কে হালদারের লাগামহীন দুর্নীতির নথিপত্র সংগ্রহ করে দুদক। এসব নথিতে দেখা যায়, পিকে হালদার অস্তিত্বহীন ৩০-৪০টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণের নামে জালিয়াতি করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড ও পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস থেকে আত্মসাৎ করেছেন প্রায় ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ও পিপলস লিজিং থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
চুক্তির আওতায় পি কে হালদারকে ফেরানো হবে : আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদারের বিষয়ে ভারতের সাথে আনঅফিসিয়াল তথ্য বিনিময় হচ্ছে। বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ। পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যমকে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও আইন রয়েছে। ভারতের সাথে আমাদের বন্দিবিনিময় চুক্তি রয়েছে। আমরা এখন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম। অফিসিয়ালভাবে জানতে হবে, জানার পরে যোগাযোগ করব। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জননিরাপত্তা বিভাগসহ সবাই মিলে একসাথে যোগাযোগ করা হবে।
যেভাবে ফেরত আনা হতে পারে : কোনো বন্দিকে ফেরত আনার ব্যাপারে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যথাযথ মাধ্যমে সেই দেশের সরকারকে চিঠি দেয়। চিঠি পাওয়ার পর সেই দেশের সরকার বিবেচনা করবে। পরে বিনিময়ের মতো হলে তারা বন্দীকে ফেরত দেবে। পি কে হালদারের বিষয়ে অন্য কোনো জটিলতা না থাকলে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিন মাসের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
২০১৩ সালের অক্টোবরে ভারতের সাথে বহিঃসমর্পণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। এ চুক্তির আওতায় দুই দেশ বন্দিবিনিময় করার সুযোগ পাবে। এ চুক্তি হওয়ার আগে অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত পার করিয়ে দুই দেশের মধ্যে বন্দিবিনিময় হতো।
বাংলাদেশের কারাগারে থাকা ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারত চাওয়ার পর থেকে এই বন্দিবিনিময় বা বহিঃসমর্পণ চুক্তির বিষয়টি সামনে আসে। তবে সাধারণত বন্দী ফেরত দেয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশ বন্দীর বিরুদ্ধে আদালতের দেয়া সাজা দেখতে চায়। ২০২১ সালের ৮ জানুয়ারি দুদকের অনুরোধে পি কে হালদারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল।



