আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নতুন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করেছে পাঁচটি দল ও দু’টি সংগঠন। নতুন এই রাজনৈতিক মোর্চার নাম ঠিক করা হয়েছে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই রাজনৈতিক মোর্চা গঠনের কার্যক্রম প্রায় শেষ। এখন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আরেকটি বৈঠক হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতির মাঠে আত্মপ্রকাশ করবে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। এরপর জনস্বার্থ ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচির মাধ্যমে অন্যান্য সমমনা দল ও সংগঠনগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এভাবে একপর্যায়ে সব বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে সাথে নিয়ে পৃথকভাবে যুগপৎ আন্দোলনে মাঠে নামবে গণতন্ত্র মঞ্চ। গণতন্ত্র মঞ্চে থাকছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। এ দিকে জুনের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা এবং নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করবে ভাসানী অনুসারী পরিষদ।
জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের অধীনে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও বর্তমান সরকারের দ্রুত পদত্যাগ দাবি করে আসছেন সাত দলের শীর্ষ নেতারা। তারা বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। এ দাবিতে বর্তমানে সবাই ঐকমত্য পোষণ করছেন। একই দাবিতে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও একটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট গঠনে কাজ করছে। নতুন রাজনৈতিক মোর্চা গঠনের লক্ষ্যে গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রথম বৈঠকে বসেন সাত দলের শীর্ষ নেতারা। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে নাÑ এমন আশঙ্কা নিয়ে ওই বৈঠকে মতৈক্য হয়। এরপর গত ১০ মে রাজধানীর হাতিরপুলে গণসংহতি আন্দোলনের কার্যালয়ে সাত দলের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসেন। তারা নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের নাম নির্ধারণ, কর্মসূচি প্রণয়ন, অন্য দলের জোটে অন্তর্ভুক্তিকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। গত ২৯ মে রোববার ফের রাজধানীর উত্তরায় জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের বাসায় বৈঠকে বসেন নেতারা। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সাত দলের যৌথ রাজনৈতিক উদ্যোগকে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের লক্ষ্যে ঐকমত্য হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যথাসম্ভব স্বল্পতম সময়ে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে এ মঞ্চ আত্মপ্রকাশ করবে। সভায় একই সাথে বর্তমান ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন মোকাবেলায় গণতন্ত্র মঞ্চের রাজনৈতিক ভিত্তি ও কর্মসূচিগুলো চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জানা গেছে, আগামী ১২ জুন সাত দলের শীর্ষ নেতারা গণ অধিকার পরিষদের অফিসে মিটিংয়ে বসবেন। সেখানেই ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র আত্মপ্রকাশের তারিখ ও কর্মসূচি চূড়ান্ত এবং অতিদ্রুত ঘোষণা করা হবে। তার আগে ১০ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ভাসানী অনুসারী পরিষদের উদ্যোগে শ্রমিক সমাবেশ হবে। সেখানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ অনেকেই বক্তব্য রাখবেন।
জানতে চাইলে আ স ম আবদুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন করেছি। খুব দ্রুত আরেকটি সভায় পরবর্তী করণীয় চূড়ান্ত করা হবে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমরা বেশ কিছু দিন ধরে সাত দলের নেতারা নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের কাজ করছি; যা একেবারেই শেষ দিকে। পরবর্তী সভায় আমরা চূড়ান্ত করে বিস্তারিত জানাবো।
জানা গেছে, গত রোববারের সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী তৎপরতায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করা হয় এবং বলা হয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে বিপন্ন করেছে ছাত্রলীগ। প্রস্তাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকায় নিন্দা ও দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়।
জানতে চাইলে ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়, অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর হতে হবে। সেই লক্ষ্যে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এসব দাবি ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সাত দলের সমন্বয়ে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র ঘোষণা হবে। তিনি বলেন, বিএনপি জোট, ইসলামী জোট, সাত দল ও সংগঠনের মঞ্চ পৃথকভাবে যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। খুব দ্রুত সময়েই কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
রাজনৈতিক দল করবে ভাসানী অনুসারী পরিষদ : এ দিকে জুনের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করতে যাচ্ছে ভাসানী অনুসারী পরিষদ। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আদর্শ প্রতিষ্ঠাকল্পে শিগগিরই একটি রাজনৈতিক নতুন দলের ঘোষণা দেবে সংগঠনটি। মূল স্লোগান থাকবে ‘মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ’। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে জেলায় জেলায় সংগঠন গোছানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভাসানী অনুসারী পরিষদ। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন ভাষাসৈনিক মরহুম আবদুল মতিন এবং প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ছাত্রনেতা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু। ২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর আবদুল মতিনের মৃত্যুর পর সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী। অদ্যাবধি তিনি ও শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা সঙ্কটে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভাসানী অনুসারী পরিষদ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এবার রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে চায় ভাসানী অনুসারী পরিষদ।
সংগঠনের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। নতুন দলে একজন আহ্বায়ক, একজন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, চারজন যুগ্ম আহ্বায়ক, একজন সদস্য সচিব, এক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক, দু-তিন সিনিয়র সহকারী সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক, দফতর সম্পাদকসহ ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে হবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।



