জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার ইস্যুতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মোট তিন ধাপে চলমান সংলাপের প্রথম ধাপে গত রোববার ১৩টি রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। আজ মঙ্গলবার দ্বিতীয় ধাপে বিএনপিসহ ১৩টি দলকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে আজকের সংলাপে বিএনপি, জেএসডি, মুসলিম লীগসহ কয়েকটি ইসলামী দল অংশ নেবে না। একই সাথে আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের সংলাপে বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ কয়েকটি দল যাবে না বলে সংশ্লিষ্ট দলের নেতারা জানিয়েছেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, এই নির্বাচন কমিশনের কোনো বিষয়ে তারা সাড়া দিবেন না। আর সংলাপের তো প্রশ্নই ওঠে না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও সংলাপে অংশ নেয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, প্রতি দফায় ১৩টি দলের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করবে ইসি। আজ দ্বিতীয় ধাপে বিএনপিসহ ১৩টি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ হওয়ার কথা। সর্বশেষ ২৬ জুনের পরিবর্তে ২৮ জুন আওয়ামী লীগসহ ১৩টি দলের সাথে বৈঠক করবে ইসি।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হলে কাজী হাবিবুল আউয়ালকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) করে পাঁচ সদস্যের নতুন ইসি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। পরে ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করে নতুন ইসি। দায়িত্ব নেয়ার পর সাবেক নির্বাচন কমিশনার, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকসহ পেশাজীবীদের সাথে ধারাবাহিক সংলাপ করে আসছে নতুন নির্বাচন কমিশন। এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ হচ্ছে। মূলত ইভিএমের কারিগরি দিক যাচাইয়ে দলগুলোর প্রতিনিধি ও কারিগরি টিমের সাথে এই বৈঠকের আয়োজন।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে বিএনপি। ইসি গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি আহূত সংলাপেও অংশ নেয়নি দলটি। এমনকি রাষ্ট্রপতির গঠিত সার্চ কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেন নেতারা। সার্চ কমিটি ইসি গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নাম চাইলে তাতেও সাড়া দেয়নি। একইভাবে একাধিক বাম দল, বিশ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নেয়নি। তারাও ইসি গঠনের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে। একাধিক দলের নেতারা বলেন, বেশির ভাগ দলের অংশগ্রহণ ও মতামত উপেক্ষা করে বর্তমান ইসি গঠন করা হয়েছে। যদিও শুরু থেকেই নতুন কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করে এর বিরোধিতা করে আসছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। এসব দলের নেতাদের অভিযোগ, বর্তমান কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট। তাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সময়ে সরকারের সুবিধাভোগী এবং সরকার সমর্থক। এমতাবস্থায় বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক মনে করেন বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করার ক্ষেত্রে কমিশনের তেমন কিছু করার নেই। তাই তাদের কাছে এই মুহূর্তে ইসির কর্মকাণ্ড মুখ্য নয়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার। ফলে ইসির সংলাপে অংশ নেয়া মানে তাদেরকে বৈধতা দেয়া। আমরা ইসিকে বৈধতা দিতে চাই না।
এ দিকে ইসির সাথে সংলাপের চিঠি পাওয়ার পর না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান ইসির সাথে সংলাপে বসার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা সংলাপে যাব না। আমরা নির্বাচন কমিশনের কোনো বিষয়েই সাড়া দিবো না। তাদের সাথে কোনো ডায়ালগ হতে পারে না।
জানা গেছে, ২০ দলীয় জোটের বিএনপিসহ চারটি দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত। অন্য দলগুলো হলোÑ লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা ২০ দলীয় জোটে থাকলেও আদালতের নির্দেশে দলটির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে।
সংলাপে যাবে না জেএসডি : এ দিকে ইসির আজকের সংলাপে অংশ নেবে না জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। গতকাল সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলের মতবিনিময় সভায় (২১ জুন) অংশগ্রহণের জন্য ইসির পক্ষ থেকে জেএসডিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু ইসির মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করা অর্থহীন ও অপ্রয়োজন মনে করে বিধায় জেএসডি অংশগ্রহণ করবে না। কেননা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের দাবি কোনো রাজনৈতিক দল বা জনগণের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়নি। ইভিএম জনগণের ইচ্ছা প্রকাশের অন্তরায় এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা। জনগণ বিশ্বাস করে ইভিএম সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার ‘ডিজিটাল কারচুপির’ নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার। বিশে^ প্রযুক্তির অধিকারী যেমনÑ যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি ও মালয়েশিয়াসহ বহু দেশ যেখানে ইভিএম বর্জন করছে সেখানে প্রযুক্তিগত দিক থেকে পেছনে পড়া বাংলাদেশ ইভিএম ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে, তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাব। তবে ইসির সংলাপে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, আমরা ইসির সংলাপের আমন্ত্রণ পেয়েছি। এখনো পর্যবেক্ষণ করছি। তবে সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ অতীতে ইসি গঠনে আমরা কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম। কিন্তু আমলে নেয়া বা না নেয়ার বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। সুতরাং অনর্থক কিছু করার দরকার কি?
জানতে চাইলে বিশ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) মহাসচিব শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী বলেন, আমরা জোটগত সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচন কমিশনের সংলাপে অংশ নেব না।
২০ দল ও বাম দলগুলো যাবে না ইসির সংলাপে
জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার ইস্যুতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মোট তিন ধাপে চলমান সংলাপের...



