করোনার ধকল থেকে কোনোমতে কেটে ওঠার পর নতুন করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট। এরই মধ্যে লোডশেডিং। ফলে নারায়ণগঞ্জে শিল্পকারখানায় দিন দিন কমছে উৎপাদন। লোকসানের ঘানি টানতে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে এমন মন্তব্য করে শিল্প মালিকদের অনেকে বলেছেন, এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে আমাদের পথে বসতে হবে। নারায়ণগঞ্জের শিল্প মালিকদের মধ্যে এখন বোবা কান্না চলছে। করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গ্যাস সঙ্কট এবং সবশেষ লোডশেডিংয়ে পণ্য উৎপাদন হুমকিতে পড়েছে বলে জানান তারা।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ঘুরে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সমস্যা দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চলছে উৎপাদন কাজ। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এ পদ্ধতিতেও কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে কারখানার অর্ডার। বেতন ভাতা ঠিকমতো না পাওয়ায় অনেক শ্রমিক চাকরি ছেড়ে দেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।
ফতুল্লা বিসিক শিল্প এলাকার নিটিং কারখানার ম্যানেজার মনির হোসেন গতকাল বুধবার দুপুরে নয়া দিগন্তকে জানান, কারখানায় অর্ডার কমেছে। কারখানায় তেমন কাজ নেই। মালিক ভর্তুকি দিয়ে কারখানা চালাচ্ছেন। এখন যে অবস্থা চলছে করোনার সময়ও এমন ছিল না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কী হবে জানি না। গ্যাসের চাপ কম এখন আবার লোডশেডিং; এতে খারাপ সময় যাচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে রফতানি খাতে চাপ বাড়বে। বাড়বে উৎপাদন ব্যয়। এ ছাড়া ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে হবে। এরই মধ্যে রফতানি আদেশ কমতে শুরু করেছে।
এইচ এম অ্যাপারেলসের মার্চেন্ডাইজার রাজীব সরকার বলেন, ঠিকমতো বেতন না পাওয়ায় চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, ‘যখন যোগ দেই তখনো বুঝতে পারিনি কারখানায় কাজ নেই। যোগ দেয়ার পর বুঝলাম কাজ কম। বেতনও ঠিকমতো পেতাম না। তাই চাকরি ছেড়েছি। এখন বেকার। নতুন কোথাও যোগ দেয়ার চেষ্টা করছি।’
নারায়ণগঞ্জ শহরের হোসিয়ারির ম্যানেজার আসলাম হোসেন জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কম হলে লেবার খরচ ঠিকই হচ্ছে। উৎপাদন কম হওয়ায় ঘাটতি থাকছে। অনেক জায়গায় জেনারেটর না থাকায় প্রোডাকশনে ক্ষতি হচ্ছে। ফলে অনেকেই রাগ করে কাজ ছাড়ছে। তিনি আরো বলেন, ‘অনেক শিডিউলের বাইরেও লোডশেডিং হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারিভাবে অন্য কোনোভাবে পদক্ষেপ নেয়া হলে হয়তো শিল্প মালিকদের সুবিধা হবে।’ আর এস কম্পোজিটের প্রোপ্রাইটার মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, ‘এ মুহূর্তে গ্যাস অনেক বড় সঙ্কট। বিদ্যুৎ সঙ্কট কিছুটা জরিমানা দিয়ে আমরা পার পেয়ে যাচ্ছি। কারণ প্রতিটি কারখানায়ই জেনারেটর রয়েছে। তাতে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এর পরও সেটি কোনো রকম মোকাবেলা করা যাচ্ছে। তবে গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’ বিসিক নারায়ণগঞ্জের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ আশিকুর রহমান বলেন, বেশির ভাগ কারখানায় ২৪ ঘণ্টা কাজ চলমান। যে সময় লোডশেডিং থাকে সে সময় তারা বিকল্প ব্যবস্থা কিংবা জেনারেটর ব্যবহার করেন। এর বাইরে সরাসরি কোনো প্রভাব নেই। বিকল্প ব্যবস্থার কারণে ডিজেল খরচ বাড়বে। এক ঘণ্টা লোডশেডিং হলে বেশি প্রভাব পড়ার কথা না। যদি লোডশেডিং দীর্ঘমেয়াদি হয় তা হলে হয়তো প্রভাব পড়তে পারে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন গার্মেন্ট মালিক জানান, শিল্পখাতে লোডশেডিংয়ের কারণে প্রভাব পড়ে থাকে। আমাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। তবে আমাদের ক্ষেত্রে আরেকটু বেশি সমস্যা হচ্ছে। যেহেতু এক্সপোর্ট করি। এক্সপোর্টের জন্য প্রতিটি জিনিসের বাইন্ডিং থাকে। সময়মতো যখন শিপমেন্ট করতে না পারব তখন এ পণ্য বাতিল হয়ে যাবে। এতে সার্বিকভাবে দেশেরই লস। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, কারখানাগুলো লোডশেডিংয়ের এলোমেলো তথ্য দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ব্র্যান্ড ক্রেতারা পোশাকের দরে এক সেন্টকেও খুব গুরুত্ব দেন। কম পেলে রফতানি আদেশ সরিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র ভাববে না। লোডশেডিংয়ের শিডিউল মানা গেলে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার আগে-পরে অথবা ছুটির দিনে কাজ করিয়ে ক্ষতি পোষানো সম্ভব হতো। এমনিতেই অর্ডার কম, যেসব অর্ডার রয়েছে সেগুলো সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারলে হাতছাড়া হয়ে যাবে। ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোর্শেদ বলেন, নারায়ণগঞ্জে চার ভাগে লোডশেডিংয়ের শিডিউল করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু এলাকা দুই ঘণ্টা এবং কিছু এলাকায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের শিডিউল রয়েছে। যেসব এলাকায় শিল্পকারখানা আছে সে এলাকার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে লোডশেডিংয়ের শিডিউল করা হয়েছে।
শিল্প মালিকদের বোবা কান্না নারায়ণগঞ্জে
গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে উৎপাদন কমছে; পণ্যের অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা
করোনার ধকল থেকে কোনোমতে কেটে ওঠার পর নতুন করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট। এরই মধ্যে লোডশেডিং। ফলে নারায়ণগঞ্জে শিল্পকারখানায় দিন দিন কমছে উৎপাদন। লোকসানের ঘানি টানতে গিয়ে...



