বরগুনায় শোক দিবসে আলোচনা সভা শেষে স্থানীয় বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সামনেই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বরগুনা জেলা পুলিশ এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এ ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু পুলিশকে দায়ী করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: মোহাররম আলীকে বরখাস্ত করার দাবি জানান।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো: মেহেদী হাসান জানান, সোমবার শোক দিবসে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল। এ ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) এস এম তারেক রহমানকে প্রধান এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পাথরঘাটা সার্কেল) তোফায়েল হোসেন সরকার ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পাবলিক রিলেশন অফিসার (ইন্সপেক্টর) মো: শাহবুদ্দিন খানকে নিয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে এর আগে গত সোমবার রাতে বরগুনা প্রেসক্লাবে শোকসভা অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু পুলিশকে দায়ী করেন। তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: মোহাররম আলীকে বরখাস্ত করারও দাবি জানান।
তিনি আরো বলেন, আমরা চাই, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখুক এবং তাকে বিচারের আওতায় আনুক। আমি যেখানে উপস্থিত সেখানে তিনি এমন কাজ করতে পারেন না। আমি তাকে মারপিট করতে নিষেধ করেছিলাম। তারা (পুলিশ) আমার কথা শোনেনি।
সদ্য ঘোষিত জেলা ছাত্রলীগের কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের পরামর্শ ছাড়াই জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। সম্মেলনের আগে কাউন্সিল বাধ্যতামূলক, এ কমিটি দেয়ার আগে সেটাও করা হয়নি।
ছাত্রলীগ করতে যে পাঁচ শর্তের কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সে শর্তগুলো কমিটিতে মানা হয়নি। আমরা আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবকদের বিষয়টি জানিয়েছি। সেখান থেকে নির্দেশনা আসার অপেক্ষা করছি। এসব বিষয়ে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌশিকুর রহমান ইমরান বলেন, আমাদের ওপরে পরিকল্পিতভাবে হামলা করে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু সন্ত্রাসীরা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ও তদন্ত কমিটির প্রধান এসএম তারেক রহমানের বক্তব্য নিতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
এত পুলিশ এসেছে যে কমান্ড শোনার মতো কেউ ছিল না : শম্ভু
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যে গাড়ি ভাঙচুর করেছে তাকে তারা চিনতে পেরেছে। আমি বলেছিলাম, যে ভাঙচুর করেছে তাকে দেখিয়ে দিন। আমি তাকে আপনাদের হাতে সোপর্দ করব। কিন্তু তাদের (পুলিশের) উদ্দেশ্যেই ছিল এই ছেলেদের মারবে। আমি তাদের মার ফেরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওখানে এত পুলিশ এসেছে যে সেখানে কমান্ড শোনার মতো কেউ ছিল না। সাংবাদিকদের সাথে এমনটাই বলেন বরগুনা ১ আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। গত সোমবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে শম্ভু আরো বলেন, দুপুরে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ওখানে পুলিশ অফিসার মহররম আলী ছিলেন। তিনি যেসব কমান্ড করেছেন তার কিছুই হয়নি। আজকে তিনি অনেক ভুল করেছেন। আমরা চাই তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখুক এবং তাকে বিচারের আওতায় আনুক। আমি যেখানে উপস্থিত সেখানে তিনি এমন কাজ করতে পারেন না। আমি তাকে মারপিট করতে নিষেধ করেছিলাম। তারা (পুলিশরা) আমার কথা শোনেনি। বিষয়টি দেখার জন্য ডিআইজি এডিশনাল জিআইজিকে পাঠিয়েছেন বলে জানান তিনি।
পুলিশকে ধন্যবাদ জানাল বরগুনা জেলা ছাত্রলীগ : ১৫ আগস্ট শোক দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বরগুনায় ছাত্রলীগের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করেছে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের একাংশ। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জকে সমর্থন জানিয়ে পুলিশকে ধন্যবাদ জানায় বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল কবির রেজা।
সোমবার রাত ১০টার দিকে বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা ছাত্রলীগের একাংশ। এতে উপস্থিত ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল কবির রেজা ও সাধারণ সম্পাদক তৌশিকুর রহমান ইমরানসহ তাদের সমর্থকরা।
সংবাদ সম্মেলনে রেজাউল কবির রেজা বলেন, আমরা শোক র্যলি নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় দুষ্কৃতকারীরা আমাদের লক্ষ্য করে পেছন থেকে ইট পাটকেল ছোড়ে। এতে পুলিশের গাড়িসহ কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর হয়। আমরা আমাদের নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করি। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই যে, পুলিশের সাথে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করে খবর প্রচার করা হচ্ছে। তবে আমি বলতে চাই, পুলিশের সাথে ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মীর সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী সম্পৃক্ত থেকেও থাকলে সে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না। আমি জেলা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই, তারা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী সম্পৃক্ত থাকলে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
যেখানে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। সেখানে ছাত্রলীগের এমন মন্তব্য সাংঘর্ষিক কি না প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তিনি (শম্ভু) আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক, তিনি আমাদের নেতা। তিনি যে বিষয়ে মন্তব্য করেছেন সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কমপ্লেক্সে ফুল দিতে যায় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে ফেরার সময় শিল্পকলা একাডেমির সামনে পৌঁছালে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত গ্রুপের সদস্যরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে দুই গ্রুপের নেতা-কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ ছাড়াও শিল্পকলা একাডেমি ভবনে আটকিয়ে গণহারে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পিটায় পুলিশ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে দীর্ঘ আট বছর পর গত ১৭ জুলাই বরগুনা শহরের সিরাজ উদ্দীন টাউন হল মিলনায়তনে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২৪ জুলাই রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির অনুমোদন দেন। এতে জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৩৩ সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই সদ্য ঘোষিত এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বরগুনা শহরে পদবঞ্চিতরা প্রতিবাদ জানাতে থাকে।



