বিএনপির ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বের হওয়া র‌্যালিতে বাধা দেয়াকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সাথে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন নেতাকর্মীদের ভয়াবহ সংঘর্ষে বন্দরনগরী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিএনপি নেতাকর্মীদের ইটপাটকেলের জবাবে পুলিশ টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও গুলি চালিয়েছে। সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন যুবদল নেতা রাজ আহমেদ শাওন। আরো একজন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে তার নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এ ছাড়া অনেক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন দুই শতাধিক নেতাকমী। সংঘর্ষের সময় প্রায় ৪ ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে নারায়ণগঞ্জ।
বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, পুলিশের গুলিতে মারা গেছে যুবদল নেতা শাওন। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা শাওন ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের গোপালনগর এলাকার শাহেদ আলীর ছেলে। সংঘর্ষে প্রায় ১৪-১৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ২নং রেলগেট এলাকায় একটি স্কুল মাঠে পুলিশের টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছে।
গুলি ও সংঘর্ষে আহতরা হলেন, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি, সোনারগাঁও থানা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান, সস্তাপুর এলাকার হাজী মহব্বতের ছেলে যুবদল নেতা শাহিন (৪০), শহরের টানবাজার এলাকার মহিবুলের ছেলে জাহাঙ্গীর (৩০), টানবাজারের ফারুকের ছেলে রাজু (২৬), সোনারগাঁওয়ের খেদমত আলীর ছেলে শরীফ (২৫), ফতুল্লার কবিরের ছেলে ইউনুস (৪৩), সিদ্ধিরগঞ্জের মতিউর রহমানের ছেলে সাগর (২২), জিমখানার আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুস সালাম (৬০), মিজমিজির মো: হাফিজ মিয়ার ছেলে মো: আখতার (৫২), দেওভোগ মিলন শেখের ছেলে স্বর্ণ শিল্পী মুন্না (১৮), দেওভোগ দাতা সড়কের শহীদ মিয়ার ছেলে মো: কাদির (২৭), ২নং রেলগেট আলমাছ পয়েন্টের মো: ইসহাকের ছেলে মো: শরীফুল ইসলাম (১৯), শহীদনগরের মো: জামালের স্ত্রী শাহনাজ (৫০), হোসাইনীনগরের হানিফ গাজীর ছেলে মো: সবুজ (৩৪), দেওভোগ পানির টাঙ্কির নূর মোহাম্মদের ছেলে মোমেন (৫৫), ২নং রেলগেটের মোজাম্মেল হকের ছেলে শিহাব (২৫), পাইকপাড়ার মৃত সুরুজ মিয়ার ছেলে শামসুল হক (৫০), বেপারীপাড়ার শাহজাহানের স্ত্রী শিল্পী (৪০), জামাইপাড়া এলাকার মো: মিলনের ছেলে মো: ইব্রাহিম (২৫), ২নং রেলগেট এলাকার কামাল হোসেনের ছেলে সিদ্ধিরগঞ্জের মুক্তি গার্মেন্টের শ্রমিক তাজুল ইসলাম (৩০), মাসদাইরের আবুল কালামের ছেলে আশরাফুল (৩২), শহরের করিম মার্কেটের ইউএস হোসিয়ারির শ্রমিক সোয়াদ হোসেন (৩০), উজ্জ্বল ভৌমিক (২৮), মিন্টু (২৮), সজিব (১৮), বন্দর রূপালী এলাকার মো: হাসেমের ছেলে মো: নাসির (৪০)
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং রেলগেট এলাকা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‌্যালি বের করলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ পাল্টা রাবার বুলেট, টিয়ার শেল ও গুলি ছোড়ে। এতে পুলিশ, সাংবাদিক, বিএনপি, ছাত্রদল যুবদলের বহু নেতা কর্মী আহত হন। এ সময় নগরীর ডিআইটি, মণ্ডলপাড়া, দেওভোগ, নিতাইগঞ্জ, ২নং রেলগেট এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পুরো নগরীর মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওই সব এলাকার রাস্তাঘাট লোকশূন্য হয়ে যায়। সংঘর্ষ চলে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত।


বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি বলেন, আমিসহ দলের দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশ গুলি ছুড়েছে। আমি নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছি। যুবদলের শাওন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আরো একজন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি, তবে তার নাম পাইনি। অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি আরো বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শহরের চুনকা পাঠাগার থেকে আমরা মিছিল নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় পুলিশ বাধা দেয়। পরে সেখান থেকে চলে আসার সময়ে শহরের ২নং রেলগেটের কাছে এলে পুলিশ ফের বাধা দেয় ও লাঠিচার্জ করে। পরে তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সদস্যসচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, সংঘর্ষে দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শতাধিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনি জানান, নিহত শাওন যুবদলের একজন নেতা। এখনো যুবদলের কমিটি হয়নি, কমিটি হলে ভালো পদ পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। সে আমাদের সাথে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে আসছে।
তিনি আরো দাবি করেন, সকালে ২নং রেলগেট এলাকায় মিছিল নিয়ে বের হওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে শাওন আহত হন। তার বুকে গুলি লেগেছে। পরে তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা: এস কে ফরহাদ বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শাওনকে হাসপাতালে আনা হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার শরীরে গুলির চিহ্ন ছিল।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বেলা ২টায় শহরের ২নং রেলগেট পুলিশ বক্সের সামনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, কেউ নিহত হওয়ার সংবাদ পুলিশের কাছে নেই। পুলিশের প্রায় ১৪ জন আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, নারায়ণগঞ্জ বিএনপি নেতাকর্মীরা কোনো রকম অনুমতি ছাড়া মিছিল বের করে, যাতে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। তাদের বারবার অনুরোধ করা হলেও রাস্তা থেকে সরেনি। উল্টো পুলিশের ওপর হামলা করেছে। পুলিশ জনগণের জানমাল নিরাপত্তায় আইনত ব্যবস্থা নিয়ে তাদের প্রতিহত করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আগে কোনো ধরনের বাধা দেয়া হয়নি।
তিনি জানান, পূর্বানুমতি ছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করেন। পুলিশ তাদের সরাতে চাইলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে জানমাল রক্ষার্থে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও শর্টগানের গুলি ছোড়ে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আমীর খসরু বলেন, এই সংঘর্ষে পুলিশের ১৫-২০ জন আহত হয়েছেন। তবে বিএনপির কতজন আহত বা নিহত হয়েছেন তা নিশ্চিত না। একজন নিহত হয়েছে বলে শুনেছি, তদন্ত করে বলতে পারব।
মিছিলের অগ্রভাগে ছিল শাওন : র‌্যালিতে অংশ নিতে জেলা যুবদলের নেতা সাদেকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি মিছিল শহরের ২নং রেলগেট এলাকায় গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে জড়ো হয়। ওই মিছিলের সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন যুবদল নেতা রাজা আহমেদ শাওন। কিন্তু কে জানত এটাই তার শেষ মিছিল। শেষ সেøাগান। বিএনপির জেলা ও মহানগর নেতাদের নেতৃত্বে র‌্যালি শুরু করার প্রস্তুতি নিলে পুলিশ ও ডিবি বাধা দেয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে পুলিশ বিএনপি নেতাদের ব্যানার কেড়ে নেয় এবং লাঠিচার্জ করে।
পরে ছত্রভঙ্গ হয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের সাথে সংঘাতে জড়ায়। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, প্রতিউত্তরে পুলিশ মুহুর্মুহু শর্টগানের গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মণ্ডলপাড়া থেকে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়ক। এ সময় পুলিশের শর্টগানের গুলিতে মারা যান আহমেদ শাওন।


টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ : নারায়ণগঞ্জ শহরে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে স্কুল মাঠে টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ৩০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আহতরা নারায়ণগঞ্জ মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। বেলা ১১টার দিকে স্কুল প্রাঙ্গণে এই ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষ চলাকালে একটি টিয়ার শেল স্কুল মাঠে এসে পড়ে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে পড়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, ঘটনার পর পুলিশের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও পুলিশ ফোন কল রিসিভ করেনি। বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ স্কুল মাঠে একটি টিয়ার শেল এসে পড়ে। এতে মাঠে খেলতে থাকা আমাদের প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঘটনার পরপরই আমরা পুলিশ সুপারকে ফোন দেই। কিন্তু তিনি আমাদের ফোন কল রিসিভ করেননি। পরে অসুস্থদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী উম্মেহানীকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। তীব্র শ্বাসকষ্টে ছটফট করছে সে। তার মা ও হাসপাতালের নার্সরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। পরে দ্রুত তাকে ইমার্জেন্সি রুম থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। একইভাবে দশম শ্রেণীর ছাত্রী আয়েশাকেও রাখা হয়েছে অক্সিজেন সাপোর্টে। সে অচেতন ছিল দীর্ঘসময়। জ্ঞান ফিরে আসার পর কিছুটা উন্নতি হয়েছে তার।
আয়েশার মা বলেন, স্কুলের মাঠে আমার মেয়ে খেলছিল, হঠাৎ টিয়ার শেল এসে পড়লে আমার মেয়েসহ আরো অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে যায়। কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে শিক্ষকরাই তাদের হাসপাতালে এনে আমাদের ফোন দেন। এসে দেখি মেয়ের এই অবস্থা।
ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুল হোসেন বলেন, আমাদের হাসপাতালে বেশ কিছু স্কুল শিক্ষার্থী টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের অক্সিজেন সেবার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
যুবদলের আটজন গুলিবিদ্ধ ঢামেকে ভর্তি : ঘটনায় গুলিবিদ্ধ আট যুবদলকর্মী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসাধীন আছেন মো: বাদল ভূঁইয়া (৩৫), নাবির হোসেন নবীন (৩০), মো: রাসেল প্রধান (৩০), মো: জুয়েল আরমান (৪০), মো: ফারুক হোসেন (৩০), মো: আকিব (২২), মো: সুলতান মাহমুদ (২৫) ও মো: আলিব (২৫)।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো: বাচ্চু মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেন জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে যুবদলের আটজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে এসেছেন। জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা চলছে।


বিভিন্ন স্থানে হামলা সংঘর্ষে দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত : এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনকালে গতকাল নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও নেত্রকোনা, মানিকগঞ্জ, নড়াইল ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হয়েছে বিএনপির। এর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের বাধা, হামলারও শিকার হয় তারা। এসব ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের দেড় শতাধিক সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নতুন নতুন মামলার আসামি হওয়া ছাড়াও সংঘর্ষের পর আটক হয়েছেন অনেক নেতাকর্মী। এর মধ্যে নেত্রকোনায় বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে সাত পুলিশসহ ২৭ জন আহত এবং আটক হন ১২। পাথরঘাটায় ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয় ছয়জন। মানিকগঞ্জে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ও টিআরশেল নিক্ষেপে আহত হয়েছেন অর্ধশত। রংপুরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দফায় দফায় বাধা দিয়েছে পুলিশ। নাটোরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আসার পথে ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন এক যুবদল নেতা।


নেত্রকোনায় বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষ
নেত্রকোনা সংবাদদাতা জানান, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকালে পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়লে সাংবাদিকসহ অন্তত ২৭জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ ১২ নেতাকর্মীকে আটক করেছে। গতকাল সকালে জেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনের প্রধান সড়কে এ ঘটনা ঘটে। সকালে শহরের জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়। কিন্তু এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শত শত নেতাকর্মী সড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এতে পুলিশ বাধা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ করে ইট পাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ টিকতে না পেরে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সংঘর্ষে সাত পুলিশসহ ২৭জন আহত হন।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম হিলালী জানান, তাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকালে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালিয়ে ৯ জনকে আটক করে নিয়ে যায়। আহতরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নেয়। সদর হাসপাতাল থেকেও পাঁচজনকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। বিএনপি নেত্রী আইনজীবী আরিফা জেসমিন নাহিন অভিযোগ করে বলেন, বিনা উসকানিতে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেটে ২০জন নেতাকর্মী আহত হন। আমি এখন কানে শুনছি না।
এদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো: ফখরুজ্জামান জুয়েল জানান, বিএনপির প্রোগ্রামে কেউ বাধা দেয়নি। তারা কার্যালয় থেকে হঠাৎ বেরিয়ে রাস্তা অবরোধ করে চলাচল ও যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। জনস্বার্থে সরে যেতে বলায় একপর্যায়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সময় আমিসহ সাত পুলিশ আহত হন।


মানিকগঞ্জে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, অর্ধশত আহত
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মানিকগঞ্জে পুলিশের সাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশসহ প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে পৌরসভার খালপাড় এলাকায় শহীদ তজু সড়কে ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষ ঘটে। বিএনপির অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রোগ্রাম চলছিল সেখানে পুলিশ বাধা প্রয়োগ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং টিআরশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সদর উপজেলার বিএনপির নেতা ফজলুল হক, যুবদল নেতা সেলিমসহ পাঁচজন বিএনপির কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। অপর দিকে সকালের দিকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠি নিয়ে খালপাড় এলাকায় অবস্থান করে। পরে শহরে ছাত্রলীগ শোডাউন করে চলে যায়।
সদর উপজেলা গিলন্ড মুন্নু সিটিতে জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খান রিতার রাজনৈতিক কার্যালয়ে জেলা বিএনপি এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে। এ সময় বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলেন, আওয়ামী ছাত্রলীগ ও কিছু অতিউৎসাহী আওয়ামী পুলিশ বিনা কারণে আমাদের মিছিলে হামলা করে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা মিছিলে আসার সময় বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের মারধর করে এবং পুলিশ তাদের সহযোগিতা করেছে।


পাথরঘাটায় ছাত্রলীগের হামলা
পাথরঘাটা (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, পাথরঘাটায় পুলিশ প্রহরায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন। সকাল ১০টার দিকে বিএনপির পাথরঘাটা দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহতদেরকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আহতরা হলেন- উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, পাথরঘাটা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন রানা, উপজেলা য্বুদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল পহলান, বিএনপি নেতা আবদুস ছালাম, মো: হিরু মিয়া ও গোলাম সরোয়ার। এ বিষয়ে পাথরঘাটা পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি আহমেদ শাহজাদা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার কারণ জানতেই আমারা সেখানে অবস্থান নেই। এর চেয়ে বেশি কিছু হয়নি।


রংপুরে দফায় দফায় পুলিশের বাধা
রংপুর অফিস জানায়, দফায় দফায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ আর বাধার মুখে পড়ে রংপুরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রা। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার থেকে দেড়টা পর্যন্ত জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বাধার মুখে পড়েন। দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকা এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে আসতে থাকলে তাতে বাধা দেয় পুলিশ। সেখানে আগে থেকেই রোড ডিভাইডার দিয়ে ব্যারিকেড বসায় পুলিশ। দফায় দফায় মিছিল আটকে দিলে নেতাকর্মীদের সাথে বাগি¦তণ্ডা হয় পুলিশের। একপর্যায়ে পুলিশ সালেক পাম্পের সামনে এবং গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে ডিভাইডার ব্যারিকেড দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বন্দী করে ফেলে। এর মধ্যে একটি মিছিল সালেক পাম্পের সামনে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শোভাযাত্রা নিয়ে জাহাজ কোম্পানি মোড়ের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ নেতাকর্মীদের লাঠিচার্জ করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পরে শাপলার দিকেও একটি শোভাযাত্রা যেতে থাকলে গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে ব্যারিকেডে আটকে দেয় পুলিশ। পরে ব্যারিকেডে বন্দী অবস্থাতেই সমাবেশ হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন- মহানগর আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু, জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, মহানগর সদস্য সচিব আনিছুর রহমার লাকু, জেলা সদস্য সচিব মাহফুজ-উন-নবী ডনসহ নেতৃবৃন্দ।


নাটোরে যুবদল নেতাকে জখম
নাটোর সংবাদদাতা জানান, নাটোরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আসা নেতাকর্মীদের উপরে ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে বিএনপির জেলা কার্যালয়ে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভা চলার সময় অফিসের সামনের মহাসড়কে জেলা ছাত্রলীগ বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় বিপুল পরিমাণ র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ বিএনপি কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশে অবস্থান নেয়।
সকাল ১০টার দিকে শহরের পশ্চিম আলাইপুরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্য সচিব রহিম নেওয়াজ, জেলা বিএনপির সদস্য শহিদুল ইসলাম বাচ্চু, অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন তালুকদার টগর, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আসাদুজ্জামান প্রমুখ।
একই সময়ে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনের মহাসড়কে বিক্ষোভরত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় গুরুদাসপুর উপজেলার মোকিমপুর গ্রামের শামীম আহমেদ (৪০) গুরুত্বর আহত হয়েছে। তাকে পুলিশ উদ্ধার করে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।