নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সাথে বিএনপির নেতাকর্মীর সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে বিএনপি নেতা রাজ আহমেদ শাওন হত্যার ঘটনায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশ এলাকায় গতকাল শুক্রবার জনসাধারণের চলাচল ছিল কম। শাওনের মৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে অনেকে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘটনার পর থেকে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিএনপির বিভিন্নপর্যায়ে নেতাকর্মীরা বলেছেন, শাওন পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। সে সক্রিয়ভাবে যুবদলের রাজনীতি করত। তবে শাওনের মামা মোতাহার হোসেন বলেন, ‘কান আছে শুনে যান, চোখ আছে দেখে যান।’ বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যাবে না। শাওনের মামার মতো অনেকে একই মন্তব্য করেন।
এ দিকে গুলিতে যুবদল নেতা শাওনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ না করে বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন নিহত শাওনের বড় ভাই মিলন প্রধান। মামলায় বিএনপির পাঁচ হাজার নেতাকর্মী ঘটনার সাথে জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়। এর আগে পুলিশ পাহারায় শাওনের লাশ নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার পর পুলিশ পাহারায় ফতুল্লার নবীনগরে নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা হয়।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কড়া পুলিশি পাহারায় নারায়ণগঞ্জে বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে গুলিতে নিহত শাওনের জানাজা ও লাশ দাফন সম্পন্ন হয়। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১টায় তার লাশ দাফন করা হয়। হস্তান্তরের পৌনে এক ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে শাওনের লাশ দাফন করা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশের উপস্থিতিতে নিহত শাওনের বড় ভাই মিলন প্রধান ও মামা মোতাহার হোসেনের কাছে লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ। পরে পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পাহারায় শাওনের লাশ বাড়িতে নেয়া হয়।এর আগে গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে চিকিৎসকরা শাওনের লাশের ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্তের সাথে যুক্ত চিকিৎসক জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
শাওনের চাচা ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শওকত আলী বলেন, রাত সোয়া ১টায় নবীনগর শাহওয়াল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নামাজে জানাজা শেষে শাওনের লাশ নবীনগর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তিনি বলেন, জানাজায় তিনিসহ শাওনের আত্মীয়স্বজন এবং এলাকার প্রায় তিন থেকে চার’শ লোক অংশ নিয়েছেন।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মামুন মাহমুদ বলেন, শাওন প্রধান যুবদলকর্মী। তিনি বিভিন্ন সময় বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। শাওনের দূর সম্পর্কের চাচা আওয়ামী লীগ নেতার কারণে এখন তারা শাওনের হত্যার বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
এ দিকে বৃহস্পতিবার রাতে শাওনকে যুবলীগকর্মী দাবি করে মিছিল করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নবীনগর এলাকায় নিহত শাওনের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিলে অংশ নেন।
জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘শাওন ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর চাচাতো ভাতিজা। শাওন যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
তবে স্থানীয় লোকজনের সূত্রে জানা গেছে, শাওন যুবদলের রাজনীতির সাথেই যুক্ত ছিলেন এবং তিনি যুবদলের কমিটিতে পদ পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ ছাড়া শাওনের ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি নিজেকে যুবদলকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন।
শাওন প্রধান যে যুবলীগের কর্মী নয়, তা নিশ্চিত করেছেন তার চাচা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী। শাওন তার চাচাতো ভাই মৃত সাহেব আলীর ছেলে।
শওকত আলী বলেন, ‘শাওন যুবলীগ কর্মী নয়, যুবদল কর্মীও নয়। সে কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়। যদি যুবদলকর্মী হয়ে থাকে, বৃহস্পতিবার মিছিলে গিয়ে থাকে, তবে সেটা আমি জানি না।’ তিনি বলেন, মিছিলের ‘ছবিতে শাওনকে দেখা যাচ্ছে। এই ছবি তো মুছে ফেলা যাবে না।’
শওকত আরো বলেন, ‘বিএনপি তাকে নিজেদের কর্মী প্রমাণ করতে পারলে বিএনপির ফায়দা আছে। কিন্তু আমি বলব, আমার সন্তান মারা গেছে। তার পরিবার যেন কোনো প্রতিহিংসার শিকার না হয়। নতুন করে এই পরিবারের লোকজন যেন ঝামেলায় না পড়ে। আমি চাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। ন্যায়বিচার হোক।’
এ দিকে গতকাল শুক্রবার সরেজমিন ঘুরে ফতুল্লার প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষের সাথে কথা হয় নয়া দিগন্তের প্রতিনিধির। তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, শাওন যুবদলের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে মৎস্যজীবী দলনেতা সলিমুল্লাহ হৃদয়, যুবদল নেতা আমীর ব্যাপারী, শাহ আলী ও মহসিন ব্যাপারীর সাথে শাওনের সখ্য ছিল। বক্তাবলী ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য চেষ্টা করছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সদস্য সাদেকুর রহমানের অনুসারী ছিলেন শাওন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাওনের এক মামা বলেন, ‘শতভাগ নিশ্চিত থাকেন, শাওন যুবদল করত। কিন্তু সবকিছু বলা যায় না। বুঝেন তো। অনেক কিছুই বলা নিষেধ।’
এ দিকে শাওনের পরিবার সূত্রে পাওয়া তার ফেসবুক আইডি ঘুরে যুবদলের রাজনীতির সাথে তার যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার ফেসবুক আইডির ‘বায়ো’তে শাওন লিখেছেন, ‘কর্মীর চেয়ে বড় কোন পদ নাই/সাক্ষী দেহের ঘামে ভেজা নগরীর রাজপথ/ফতুল্লা থানা যুবদল জিন্দাবাদ।’ এই আইডিতে শাওন নিজেকে যুবদলকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
ফেসবুক আইডিতে গত ৩১ মে শাওনের ফেসবুকে দেয়া সর্বশেষ পোস্টে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ ও যুবদল নেতা সাদিকুর রহমানের একটি ছবি শেয়ার করেছেন। ছবিটির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘নিশি রাতের ভোট চোরদেরকে বলে দিও ২০২৩ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবো ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল নারায়ণগঞ্জ জেলা।’
বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, ‘শাওন যুবদলের সক্রিয় কর্মী ছিল। আমার সাথে তার অসংখ্য ছবি আছে। শাওন প্রধান নাম হলেও রাজনীতিতে সে রাজা প্রধান নামে পরিচিত ছিল।’
ঘুরে ফিরে ছোট ছেলে শাওনকে খুঁজছেন মা ফরিদা
ঘুরে ফিরে ছোট ছেলে শাওনকে খুঁজছেন মা ফরিদা বেগম। সন্তান হারানোর শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। শাওনের মায়ের বিলাপে ফতুল্লার নবীনগরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
শুক্রবার সকালে নিহত শাওনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে চলছে শোকের মাতম। ছেলের শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা ফরিদা বেগম। স্বজনদের মধ্যেও চলছে আহাজারি। তাদের সান্ত¡না দিচ্ছেন আশপাশের প্রতিবেশীরা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিহত শাওনের বাড়িতে এলে আরো বেদনাবিধুর পরিবেশে তৈরি হয়। সবার চোখে পানি। তিনি শাওনের পরিবারকে সান্ত¡না দেন। এসময় দোয়া ও মুনাজাত করেন মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক অধিবেশন আবু আল ইউসুফ খান টিপু।
শুক্রবার সকালে ফতুল্লার নবীনগরে শাওনের বাড়িতে গেলে কথা হয় তার ভাই ফরহাদের সাথে।
তিনি বলেন, ‘আমরা তিন ভাই এক বোন ছিলাম। শাওন সবার ছোট। তাই সে সবার আদরের ছিল। তাকে হারিয়ে মা পাগল হয়ে গেছে। কাল থেকেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন।’
ফরহাদ আরো বলেন, ‘আমি এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই। আমাদের জানা ছিল না শাওন বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। কাল ছবি দেখার পর জানতে পারলাম সে যুবদল করে।’
শাওনের বড় ভাই মিলন জানান, ‘আমরা জানতাম না সে রাজনীতি করতো কি-না। আমার ভাইকে হত্যার বিচার চাই।’
শাওনের মামা মোতাহার হোসেন বলেন, ‘একই পরিবারে চারটি শোক বইতে হচ্ছে বোন ফরিদাকে। কিছুদিন আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। তার আগে এক মেয়েকে হারিয়েছেন। এরপর এক ছেলেকে হারান। সবশেষে শাওনকে হারিয়েছেন। এত শোক কিভাবে সইতে পারে একজন মানুষ।
৫ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা
নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সাথে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিতে যুবদল কর্মী রাজ আহমেদ শাওন নিহতের ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পাঁচ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করে হত্যা মামলা হয়েছে। তবে আসামির তালিকায় কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।
বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে শাওনের বড় ভাই মিলন প্রধান বাদি হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় এ মামলা করেন। মামলায় কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শাওন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ছোড়া ইট ও আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে গুরুতর জখম হয়ে শাওন মারা যান। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আমীর খসরু মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শাওন নবীনগর এলাকার একটি ওয়ার্কশপে মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সকালে শাওন ওয়ার্কশপের মালামাল কেনার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে শহরের উদ্দেশে রওনা দেন। বেলা ১টার দিকে শাওনের ভাই মিলন মুঠোফোনে খবর পান, শাওনের লাশ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে। পরে মিলন হাসপাতাল গিয়ে তার ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সকালে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের পাঁচ হাজারের বেশি নেতাকর্মী ইটপাটকেল ও লোহার রড, হকিস্টিকসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দফায় দফায় মিছিল করে এবং পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। শাওন দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় পাকা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ইটপাটকেল ছোড়েন, ককটেল বিস্ফোরণ করে ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করতে থাকলে ওই ইটপাটকেল ও অবৈধ অস্ত্রের গুলিতে শাওন মাথায় ও বুকে গুরুতর জখম হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। পরে রাস্তায় থাকা লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক শাওনকে মৃত ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে শুক্রবার সকালে মামলার বাদি মিলনের কাছে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, তার ভাইকে যারা হত্যা করেছেন, তিনি তাদের বিচার চান।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিচুর রহমান মোল্লা। তিনি জানান, বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলার সময় শাওন নিহত হয়েছেন অভিযাগ করে শাওনের বড় ভাই হত্যা মামলা করেছেন। এ ছাড়াও পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশ বক্স ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে আরো একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে। সেইসাথে ঘটনার সাথে জড়িত আছে এমন ব্যক্তিদের গ্রেফতারের চেষ্টাও করা হচ্ছে।



