নারায়গঞ্জে তীব্র গ্যাস সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গত একমাস ধরে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলি এলাকাগুলোতে সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে আবাসিক এলাকায় কোনো গ্যাসই থাকে না। এছাড়া বিকেলে ৫টার পর কোনো কোনো এলাকায় বসতবাড়িতে গ্যাস পাওয়া গেলেও তা নিভু নিভু। গ্যাস সঙ্কটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্নার কাজে চরমভাবে বিঘœ ঘটছে। অনেককে রাত জেগে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কখন পুরো প্রেশার নিয়ে গ্যাস আসবে। ফলে রান্নার জন্য রাত জেগে বসে থাকতে হয় গৃহিণীদের।
গ্যাস সংযোগের বিষয়টি স্বীকার করে নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: মামুনার রশিদ জানান, সাময়িক সময়ের জন্য আমাদের এমন গ্যাস সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে আমাদের যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা সে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ নেই। গ্যাসচালিত পাওয়ার প্লান্টগুলো বন্ধ হলে কিছুটা গ্যাস সঙ্কট মুক্ত হবো। আর আমাদের এই সঙ্কটটা যে শুধু নারায়ণগঞ্জে তা নয়। এটা সারা দেশেই বহমান আছে। আশা করি, আমরা খুব শীঘ্রই এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাবুরাইল, পাক্কারোড, দেওভোগ আখড়া, পালপাড়া, ভূইয়ারবাগ, নন্দীপাড়া, আমলাপাড়া, গলাচিপা, কলেজ রোড, জামতলা, উত্তর চাষাঢ়া, মাসদাইড়, মিশনপাড়া, খানপুর, মেট্রো হল, তল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাসের সঙ্কট। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি মাসে পুরো বিল পরিশোধ করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
শহরের পালপাড়া এলাকা বাসিন্দা আব্দুল মজিদ জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা বাজলেই গ্যাস থাকে না। কোনোরকম খেয়ে দিন কাটলেও দুপুরের খাবার খাওয়া হয় বিকেল সাড়ে ৫টার পর। তাই রান্নার কাজ সারতে হয় গভীর রাত কিংবা ভোর রাতে।
আমলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম জানান, ১৫ দিন যাবৎ গ্যাসের তীব্র সঙ্কটের মধ্যে আছি। আগে দুপুরে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সেটাও পাওয়া যায় না। ভোর ৪টা অথবা ৫টায় না উঠলে আমাদের বাসায় রান্নাই করা হয় না। বিকেলে সাড়ে ৫টার পর কিছুটা গ্যাস থাকলেও সন্ধ্যার পর পর এটা একেবারেই কমে যায়। রাত ১১টার আগে গ্যাসের কোনো আনাগোনা পাই না।
চার বছর আগেও আমরা এই সঙ্কট ভোগ করছি। গ্যাস না থাকলেও আমাদের গ্যাসের বিল দিতে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় এই গ্যাস কৃত্রিমভাবে দেয়া, যাতে করে মানুষ সিলিন্ডার গ্যাসের দিকে ধাবিত হয়।
দেওভোগ পাক্কারোড এলাকার বাসিন্দা লিজা আক্তার জানান, রাতে ঘুমাই দেরি করে, মাঝে মধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারি আবার কখনো পারি না। আলাদা জ্বালানি তেলের চুলায় রান্না করতে হয় আমাগো। এখন বাজারে যে হারে জিনিসপত্রের আর কেরোসিন তেলের দাম বাড়ছে, এতে আমাগো ডবল টাকা খরচ হইতাছে। গ্যাস না থাকায় কেরোসিন দিয়েই রান্না করতে হয়। আবার তরকারির দামও বেশি। কই যামু আমরা কন।
বন্দর এলাকায় একটি মেসের বাসিন্দা আব্দুল জলিল জানান, তিন বেলা খাবার মাসিক চুক্তিতে খাই পাশের বাসায়। কিন্তু গ্যাসের সঙ্কটের কারণে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খাবার পাই। মাঝেমধ্যেই সকালে না খেয়ে থাকতে হয়। তার উপর দুপুরের খাবার পাই বিকেলে আর রাতের খাবার পাই ১২টার পর।
এদিকে শহরের মানুষের কর্ম ব্যস্ততা ও সাংসারিক কাজ সেরে রাতে ঘুমাতে হয় ১২টার পরে। তবে নারীদের জন্য আলাদা ভোগান্তি তৈরি করেছে এই গ্যাসের সঙ্কট। এখন অনেক নারী পরিবারের জন্য রান্না করতে রাত জেগে থাকে। আবার একবার রান্না করে ফ্রিজে রেখে কয়েকবার সেই খাবার খাচ্ছে অনেকে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চল্লিশোর্ধ্ব বয়স্ক নারীদের নিত্য নতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া, ভোরে রান্না করা খাবার দুপুরে ভালো থাকে না। বেশির ভাগ সময় বাধ্য হয়েই সে খাবার খেতে হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: গোলাম মোস্তফা জানান, রাতে কম ঘুমানোর কারণে অবশ্যই স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ঘুম যদি আমাদের কম হয় তাহলে আমাদের ব্রেইন সতেজ থাকে না, এতে মেজাজ নষ্ট হয়ে যাবে। যাদের হাইপার টেনশন ও ডায়াবেটিসের সমস্যা আছে, তাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে। আর যারা সুস্থ আছে তারা অসুস্থ হয়ে যাবে।