নারায়ণগঞ্জে গত এক দেড় মাস ধরে তীব্র গ্যাসসঙ্কট চলছে। গ্যাসসঙ্কটের কারণে ভুক্তভোগী মানুষ ফুঁসে উঠে নারায়ণগঞ্জ তিতাস অফিস ঘেরাও ও স্মারকলিপি দেয়ার পর গ্যাসসঙ্কট আরো বেড়েছে। আগে দিনের বেলায় নিভু নিভু গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন দিনের বেলায় আবাসিক বাসা বাড়িতে কোনো গ্যাসই থাকে না। এ ছাড়া গ্যাসসঙ্কটের কারণে শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। বিশেষ করে নিট শিল্প ধ্বংসের পথে।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের দাবিতে গত ১২ সেপ্টেম্বর অরাজনৈতিক সংগঠন ‘আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী’র উদ্যোগে তিতাসের নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কর্মসূচি শেষে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: মামুনার রশীদের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবিতে শহরের বিভিন্ন এলাকার লোকজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে একের পর এক স্মারকলিপি দিচ্ছেন। সর্বশেষ গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে চাষাঢ়ায় তিতাস গ্যাস কার্যালয়ে বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দিয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ।
আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীর সভাপতি নূর উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে জ্বালানি গ্যাসের সঙ্কট চলছে। সঙ্কট সমাধানে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দেয়া হলেও কোনো উদ্যোগ নেই। তিতাস কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই গ্যাসের এই অবস্থা। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আমরা তিতাসের কাছে আমাদের অভিযোগ জানানোর পর আরো গ্যাসসঙ্কট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, গ্যাসের দাবিতে শুধু অবস্থান ধর্মঘটই নয়, হরতালও ডাকব। আর সেই হরতালের নেতৃত্ব দেবে আমাদের মা-বোনেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের বাবুরাইল, পাক্কারোড, দেওভোগ আখড়া, পালপাড়া, ভূঁইয়ারবাগ, নন্দীপাড়া, আমলাপাড়া, গলাচিপা, কলেজ রোড, জামতলা, উত্তর চাষাঢ়া, মাসদাইর, মিশনপাড়া, খানপুর, মেট্রো হল, দক্ষিণ সস্তাপুর, সস্তাপুর, কাঠেরপুল ও তল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সঙ্কট চলছে। এসব এলাকার মানুষ সময়মতো রান্না করতে পারছেন না।
শহরের গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা কাজী ইসলাম মিয়া বলেন, আগে দিনের কোনো না কোনো সময় গ্যাস মিললেও এখন সারাদিনই পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে বাসা থেকে না খেয়ে বের হতে হয়। দুপুরেও বাসায় গিয়ে খেতে পারি না। রাতেরটা খেতে হয় ১২টায়। কিন্তু মাস শেষে ঠিকই বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিল না দিলে আবার লাইন কেটে দেয়। এভাবে চলতে থাকলে রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।
শহরের দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সকালে খেয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিনই বাইরে থেকে নাশতা কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে কত দিন চলতে পারব। সবসময় বাইরে থেকে নাশতা কেনার সামর্থ্য নেই। খুব সীমিত আয়ে আমাদের দিন পার করতে হয়।
১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ বলেন, আমাদের হয় গ্যাস দেয়া হোক না হয় গ্যাস বিল মওকুফ করে দেয়া হোক। কর্তৃপক্ষ যেহেতু সমস্যার কথা বলছে তাহলে অন্তত দিনে বা রাতে সময় নির্ধারণ করে দুই ঘণ্টা করে গ্যাস দেয়া হোক। যাতে আমরা কোনো রকম খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি।
১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে টানবাজার, মিনাবাজার, নিমতলা, বংশাল, মণ্ডলপাড়া, আর কে দাস রোড, ওল্ড ব্যাংক রোড, ছোট ভগবানগঞ্জ, নয়ামাটি, চেম্বার রোড, পুরনো পালপাড়াসহ ওয়ার্ডের বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে জনগণের রান্নার কাজে বিঘœ হওয়ায় পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কাশীপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজারের বাসিন্দা সোনিয়া দেয়ান বলেন, ‘সারা দিন গ্যাস থাকে না। আগে কুপির মতো একটু জ্বলতো। তাতে টিপটিপ করে ভাতটা অন্তত ফুটতো। এখন তো তাও নাই। তিনি আরো বলেন, ‘যেই বাড়িতে কাজে যাই সেইখানেও গ্যাস নাই। একজনের বাড়িতে এলপি গ্যাস আর আরেকজনের স্টোভ দিয়ে রান্না করি। তাগো ট্যাকা আছে তারা পারে, আমগোর জীবন কষ্টের!’
এমপি শামীম ওসমানের চিঠি
এ দিকে গ্যাসসঙ্কট নিরসনের দাবি জানিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান। চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: মামুনার রশিদ। তিনি বলেন, আমরা তার এ চিঠি গ্রহণ করে ইতোমধ্যে ঢাকায় হেড অফিসে পাঠিয়েছি। হেড অফিস থেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নিট শিল্প
এ দিকে গ্যাসের সঙ্কটে সদর উপজেলার বিসিক শিল্পনগরী, আদমজী ইপিজেডসহ বন্দর, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলার কয়েক শ’ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশী ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এভাবে চলতে থাকলে রফতানি আয় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে মনে করছেন নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নেতারা।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘জুন মাস থেকে গ্যাসের সঙ্কট শুরু হয়েছে। শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা। কারখানার মেশিন চালানোর জন্য অন্তত পাঁচ পিএসআই গ্যাসের চাপ থাকা লাগে। কারখানাগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ দেড় পিএসআই। গ্যাসের চাপ কম থাকায় তার ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিলস নামে কারখানাটিতে ৬০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তারা বলেন, ‘বিদেশী ক্রেতাদের ঠিকমতো শিপমেন্ট দিতে পারছি না। এতে তারা আমাদের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। আবার ব্যাংকের টাকাও সময়মতো পরিশোধ করতে পারছি না।’
গার্মেন্ট ও ডাইং ব্যবসায়ী মজিবুর রহমান বলেন, বিল দিচ্ছি গ্যাসের কিন্তু পাচ্ছি বাতাস। বাতাস দিয়ে তো আর ফ্যাক্টরি চালাতে পারব না। গত দুই মাসের তীব্র গ্যাসসঙ্কটে শিল্প ও বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ঘরের গৃহিণীদের এখন চলছে ত্রাহী অবস্থা। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক ও শিল্প গ্রাহকেরা।
নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, গ্যাসসঙ্কটে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে নিটওয়্যার সেক্টর। কখনো সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা বেশি গ্যাস থাকে না। যেখানে আমাদের ১৫ পিএসআই সংযোগ নেয়া সেখানে আমাদের ৭-১০ পিএসআই পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকে। কিন্তু গত দুই মাস ধরে গ্যাসের যে চাপ পাওয়া যায় তা মাত্র ০.৫ থেকে ১ পিএসআই। এর ফলে আমাদের উৎপাদন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে। যার ফলে উৎপাদনে আগামী মাসে বড় ধরনের ধস নামবে। ফ্যাক্টরিতে ডাইং থেকে ফেব্রিক্স না আসার কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে একটা বড় ধরনের সঙ্কটে পড়বে নিটওয়্যার সেক্টর। আমরা সরকারের কাছে বলেছি, রিজার্ভ থেকে তিন-চার বিলিয়ন ডলার লোন দিতে এলএনজি আমদানির জন্য। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি আগামী ছয় মাসের মধ্যে রিজার্ভে তিনগুণ টাকা ফেরত দিব।
তিতাসের নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো: মামুনার রশীদ বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ঠিক রাখতে বেশি গ্যাস দিতে হচ্ছে। এটা শুধু নারায়ণগঞ্জে নয় পুরো দেশের একই অবস্থা। আমরা দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নারায়ণগঞ্জে মানুষের কাছে আহ্বান থাকবে আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন। সরকারকে সহায়তা করুন। আশা করি শিগগিরই এ সঙ্কট কাটিয়ে উঠব।
তিনি বলেন, সিস্টেম থেকে গ্যাস সাপ্লাই কম আসছে। গত আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ২ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সাপ্লাই এসেছে এই জেলায়। কিন্তু চাহিদা তিন মিলিয়ন কিউবিক মিটারেরও ওপরে। তার ওপর বিদ্যুৎসঙ্কট নিরসনে গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ প্ল্যান্টে গ্যাস সরবরাহ করতে হচ্ছে। যার ফলে গ্রাহক পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে পারছি না।
গ্যাসের সঙ্কট নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিতাসের এই কর্মকর্তা বলেন, সঙ্কট নিরসনে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে পেট্রোবাংলা। সেগুলো বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি গ্যাসের এ সঙ্কট থাকবে না। তবে আগামী কয়েক মাস অর্থাৎ শীতকাল পর্যন্ত গ্যাসের এ সঙ্কট থাকবে বলে জানান তিনি।
তিতাস অফিস ঘেরাওয়ের পর না’গঞ্জে বেড়েছে গ্যাসসঙ্কট
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি নিট শিল্পে; অনেক বাসায় দিনে কোনো রান্না হয় না
নারায়ণগঞ্জে গত এক দেড় মাস ধরে তীব্র গ্যাসসঙ্কট চলছে। গ্যাসসঙ্কটের কারণে ভুক্তভোগী মানুষ ফুঁসে উঠে নারায়ণগঞ্জ তিতাস অফিস ঘেরাও ও স্মারকলিপি দেয়ার পর গ্যাসসঙ্কট আরো...



