-ঢাকার গণসমাবেশ টার্গেট করে তৎপরতা
-কারাগারে বন্দী ও পঙ্গু কর্মীরাও আসামি
ঢাকায় ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশকে টার্গেট করে রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও আশপাশের জেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার হিড়িক পড়েছে। অতীতে বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করলেও গত কিছুদিন যাবৎ রাজধানীসহ বিভিন্ন থানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি বানিয়ে মামলা করতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের। প্রায় প্রতিটি মামলার অভিযোগে বাদি (আওয়ামী লীগ নেতারা) তাদের ওপর হামলা, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কথা উল্লেখ করছেন।
গত রোববার রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থানা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ হাসান বাদি হয়ে থানা বিএনপির ৭০ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ এবং আরো ২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করেন। অভিযোগে বাদি উল্লেখ করেন, গত ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় ৪০ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের এক সভায় বিবাদিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। সেখানে বিএনপি নেতাকর্মীদের ককটেল বিস্ফোরণ ও মারধরে বাদিসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আহত হয়।
কিন্তু বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি- মামলায় উল্লেখিত ঘটনাগুলো সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। এর মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই মামলায় কারাগারে থাকা সাবেক ছাত্রদল নেতা হারুন উর রশিদ সুমনকেও আসামি করা হয়েছে।
এ দিকে গত ১২ নভেম্বর যুবলীগ নেতা হাবিব সর্দার বাদি হয়ে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ১৭ জনকে আসামি করে রাজধানীর কদমতলী থানায় একটি মামলা করেন। এতে ছয়জন বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। মামলার বাদি অভিযোগে উল্লেখ করেন, ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যুবলীগের সমাবেশ থেকে ফেরার পথে আসামিরা বাদি ও তার সাথে থাকা ১২-১৪ জন শ্রমিক লীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালিয়ে তাদের আহত করে এবং টাকা, মোবাইল ও অন্যান্য জিনিস লুট করে।
তবে বিএনপির দাবি- ওই দিন ঘটনাস্থলে সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতা হাসান মামুনের সাথে তার এলাকার কিছু অরাজনৈতিক লোক দেখা করতে এসেছিলেন। হাসান মামুন তার কাছে আসা অতিথিদের নিয়ে দোকানে চা খাচ্ছিলেন। এ সময় যুবলীগ নেতা হাবিব সর্দারের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় উল্টো বিএনপির ছয় নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা জানতে পারেন ১৭ জনকে আসামি করে যুবলীগ নেতা একটি মামলাও করেছেন।
প্রায় একই ধরনের হামলার অভিযোগ এনে শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগ নেতা মো: সাঈদ বাদি হয়ে ২৫ বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ ও আরো ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করেন। এই মামলায় তিন বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে বলে জানায় বিএনপি।
এ ছাড়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো: মনির হোসেন বাদি হয়ে ২৪ বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ ও আরো ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ডেমরা থানায় একটি মামলা করেন। এই মামলায় বিএনপির পাঁচজন নেতাকর্মী গ্রেফতার হন।
বংশালে আওয়ামী লীগ নেতা মফিজ উল্লাহ খান মাইনু বাদি হয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ এবং আরো ৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করেন।
অন্য দিকে গত রোববার আওয়ামী লীগ নেতা মো: সিরাজ বাদি হয়ে কামরাঙ্গীরচর থানায় স্থানীয় ২৩ জন বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ আরো ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে একটি মামলা করেন। এতে বাদি উল্লেখ করেন, আসামিরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সভা চলাকালে হামলা চালিয়ে নেতাকর্মীদের আহত করে এবং অফিসের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। তবে বিএনপির দাবি- আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরাই তাদের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে বিএনপির নামে মামলা দিয়েছে।
এ দিকে জানা যায়, রাজধানীর পাশের সোনারগাঁও উপজেলায় শ্রমিক লীগ নেতা হালিম মেম্বার বংশগত বিরোধিতার জেরে গত ১৬ নভেম্বর স্থানীয় পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিলের ওপর হামলা চালিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেন। পরে আহত জলিলকে হাসপাতালে নেয়ার পথে গাড়ি আটকিয়ে তার পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় এবং নিজেরাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে ভাঙচুর করে। এ সময় জলিলের পরিবারের আরো দু’জন আহত হন। আহত জলিলের মাথায় ৩৫টি সেলাই হয়। পরদিন ১৭ নভেম্বর শ্রমিক লীগ নেতা হালিম মেম্বার বাদি হয়ে আহত বিএনপি নেতা জলিলসহ ২৫ বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ এবং আরো ১৫-২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
স্থানীয় বিএনপির দাবি- একটি পারিবারিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি হলেও বিএনপি নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের মধ্যে সাবেক থানা যুবদল সম্পাদক আব্দুর রউফ প্যারালাইজড রোগী ও সাবেক থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম জনি দীর্ঘদিন প্রবাসী।
মামলার শিকার বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা হঠাৎ করে এক একটি মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে নামে-বেনামে মামলা দায়ের করছেন। যেসব ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানিই না। এতে থানা বিএনপি, ওয়ার্ড বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের শত শত নেতাকর্মীদের আসামি করা হচ্ছে। ঘটনার সময় কারাগারে থাকা কর্মীকেও মামলার আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেছেন, ঢাকায় আগামী ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশকে বানচাল করার জন্য আওয়ামী লীগ এসব বানোয়াট মামলা করে তাদের অনুগত পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে নিরীহ নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে। তবে তাদের কোনো বাধা আর কাজে আসবে না। সকল বাধা অতিক্রম করে বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে সর্বস্তরের মানুষ সমাবেশে অংশ নিবেন এবং স্মরণকালের সেরা সমাবেশে পরিণত করবেন। মুক্তিকামী মানুষ পুরো রাজধানীকে জনসমুদ্রে পরিণত করবেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম অভিযোগ করে নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছুদিন যাবৎ ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির আওতাধীন বিভিন্ন থানায় নাটক সাজিয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করছে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন মামলায় উল্লেখ করা প্রতিটি ঘটনার বর্ণনা প্রায় এক। তিনি বলেন, এসব মামলায় নিরপরাধ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হচ্ছে। আমরা এসব মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অনতিবিলম্বে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।
ফনীতে দেড় শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা
ফেনী অফিস জানায়, ফেনীতে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপি ও ছাত্রদলের ১৬৯ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। গত রোববার বিকেলে সংঘর্ষের পর রাতে ফেনী শহর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোহাম্মদ মহসিন বাদি হয়ে ফেনী মডেল থানায় মামলাটি করেন। সংঘর্ষের সময় আটক ৫ জনকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতরা হলেন ফেনী পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব ইব্রাহিম হোসেন ইবু পাটোয়ারী, ছাত্রদল কর্মী নিজাম উদ্দিন, আবদুল্লাহ আল নোমান, আবির ইসলাম ও যুবদল কর্মী মো: আলাউদ্দিন। গতকাল তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলায় ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে ১৫৫ নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুর রহমান বকুল, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মনোয়ার হোসেন দুলাল, জেলা যুবদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারী, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম মিলন, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন রিয়াদ, সদর উপজেলা আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো: মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, গ্রেফতার ৫ জনকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
ফেনী মডেল থানার ওসি মো: নিজাম উদ্দিন জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও ১৫৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।



