শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছর পূর্তি পালিত হয়েছে পাহাড়ে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ চুক্তির বেশির ভাগ বিষয় বাস্তবায়নের দাবি করে বর্ণাঢ্য আয়োজনে চুক্তি স্বাক্ষরের উৎসব পালন করলেও জনসংহতি সমিতি এ দাবি অস্বীকার করে আসছে। মামলা হামলার ভয়ে জনসংহতি সমিতির অধিকাংশ নেতা এখন এলাকা ছাড়া। নেতারা এলাকায় না থাকলেও তাদের সশস্ত্র গ্রুপের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ নেই। দুর্গম এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংগঠনটির সশস্ত্র গ্রুপ এখনো নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে গত ১০ বছরে গজিয়ে উঠেছে বান্দরবানে অনেক সশস্ত্র সংগঠন। এগুলোর মধ্যে জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপ, ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ লিবারেশন পার্টি ও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ। বান্দরবানের জনসংহতি সমিতি ও অন্যান্য সংগঠনের আধিপত্যের কারণে ইউপিডিএফের তৎপরতা নেই বললেই চলে। এ ছাড়া বাঘমারা বাজারে জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপের ছয় নেতাকে গুলি করে হত্যার পর এ সংগঠনটিরও অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বর্তমানে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে জনসংহতি সমিতি (সন্তু), মগ লিবারেশন পার্টি, কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট কেএনএফ ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। এই চারটি সংগঠনের আধিপত্য লড়াই ও ব্যাপক চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে এলাকার সাধারণ লোকজন।


গত পাঁচ বছরে জনসংহতি সমিতি, মগ লিবারেশন পার্টি ও জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অর্ধশত লোক নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে উভয় দলের নেতাকর্মী সমর্থক ও সাধারণ লোকজন রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীও। সশস্ত্র এ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে আহত হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে বান্দরবানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এই অভিযানে উগ্রবাদী ছাড়াও আটক হয়েছে কেএনএফের সদস্য। সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর কর্মকাণ্ডে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যটন শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। পর্যটকদের ওপর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এখন জেলা শহরে এসে চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। সব ধরনের ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। আগে শুধু জনসংহতি সমিতি থাকলেও এখন আরো বেশ কয়েকটি সংগঠনকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। অন্য দিকে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হামলার আশঙ্কায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী সমর্থকরা দুর্গম এলাকা ছেড়ে এখন জেলা শহরে এসে বসবাস করছে।


শান্তি চুক্তির পর জেএসএস ভেঙে গঠিত হয়েছে ইউপিডিএফ। ২০০৫ সালের দিকে জেএসএস আরেক দফা ভেঙে গঠিত হয়েছে জেএসএস সংস্কার (এমএন লারমা)। ২০১৯ সালের দিকে শুধুমাত্র বান্দরবান জেলায় হঠাৎ গড়ে তোলা হয় মগ লিবারেশন পার্টি নামে আরেকটি সশস্ত্র সংগঠন। ২০২০ সালের দিকে ইউপিডিএফ ভেঙে গঠিত হয়েছে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এসব দলের সদস্যদের হাতে রয়েছে সর্বাধুনিক বিদেশী ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির দ্বন্দ্বে গত তিন বছরে বান্দরবানে এই পাঁচটি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা সঙ্ঘাতে জড়িয়ে নিহত হয়েছে ২০ জনের অধিক।