‘সেমিফাইনালে শুধু খেলেই সন্তুষ্টি খুঁজছি না আমরা। আমাদের লক্ষ্য এখন বিশ্বকাপ জয়।’ গতকাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরিগুইয়ের এই বক্তব্যে বিস্মিত হয়নি অনেকেই। যে দল কাতার বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অপরাজিত, যাদের জালে একটি মাত্র বল গেছে (তাও সেটা আত্মঘাতীতে), যারা একে একে হারিয়েছে প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষ স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়ামকে, ড্র করেছে গত বিশ্বকাপের রানার্সআপ ক্রোয়েশিয়ার সাথে, সে দলের কোচের এমন মন্তব্য করাটাই স্বাভাবিক। আজ ২০২২ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বাজির দরেও পিছিয়ে নেই উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আল বায়েত স্টেডিয়ামে আজ প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিতে খেলা এই দেশটির প্রতিপক্ষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। যাদের দলে আছে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ড। যার যোগ্য সহযোগী গ্রিজম্যান ও অলিভার জিরুড। কিন্তু মরক্কোর কোচ আজ ফ্রান্সকেও হারাতে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, যা আরেক ইতিহাস গড়বে মরক্কো, আরব এবং মুসলিম বিশ্বে।
মরক্কোকে হেলাফেলা করার মতো ভুল করছেন না ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশামও। তার মতে, মরক্কো অবশ্যই শক্তিশালী দল। তাদের কাছে একে একে হেরেছে ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো। রয়েছে দুর্ভেদ্য এক ডিফেন্সলাইন। আর পোস্টের নিচে আস্থার প্রতীক গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনো। তাই তাদেরকে আমরা বেশ গুরুত্বের সাথেই নিচ্ছি। ফ্রান্সের জন্য ফাইনালে খেলাটা নতুন কিছু নয়। ১৯৯৮, ২০০৬-এর পর ২০১৮ সালের ফাইনালিস্ট তারা। তবে গতবারের দলের কিছু খেলোয়াড় এবার নেই। তাদের বিকল্প নতুন প্রতিনিধিরা। কোচ দেশাম জানান, আমি কোনোভাবেই চার বছর আগের দলের সাথে বর্তমান দলের তুলনায় যাবো না। কিছু পরিবর্তন তো আছেই। বর্তমান দলের যোগ্যতা রয়েছে বলেই তো তারা এখন আবার সেমিতে খেলছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও দলকে তারা উদ্ধার করছে। এটাই তো টিম স্পিরিট। আমার আত্মবিশ্বাস সেমিতে মরক্কোকেও হারিয়ে আমরা শিরোপা ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করব।
ফ্রান্সকে ১৯৯৮ সালে চ্যাম্পিয়ন করানো অধিনায়ক দেশ্যামস বলেন, মরক্কোর রক্ষণভাগ এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা। কোনো দলই তাদের এই দেয়ালে ফাটল ধরাতে পারেনি। তবে রক্ষণাত্মক দল হলেও দ্রুত আক্রমণে উঠতে পারে তারা। আদায় করে নেয় গোল। সোজা কথা পরিপূর্ণ একটি দল। এরপর জানান, আমি মরক্কোর সব ম্যাচই দেখেছি। তাদের কিছু দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছি। সেমিতে সেগুলোকে পুঁজি করেই জেতার চেষ্টা করবো। টানা দুই বিশ্বকাপের সেমিতে খেলার পেছনে গোপন কিছুই নেই জানান কোচ। তার মতে, আপনাকে এক নাম্বার হতে হলে সেরাটা দিতে হবে। থাকতে হবে নাম্বার ওয়ান ফুটবলার। ফ্রান্সের তা আছে। এরপরই গ্রিজম্যানের প্রশংসা তার মুখে। গ্রিজম্যানের যে সার্ভিসটা দরকার সেটাই পাচ্ছি। সে একটু নিচে নেমে খেলে আক্রমণে সহায়তা করছে।
ফ্রান্সের অধিনায়ক হুগো লরিচের মুখেও মরক্কোর প্রশংসা। তিনিও এই বিশ্বকাপে দলটির বড় বড় টিমের বিপক্ষে জয় পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেন।
মরক্কোর কোচ রেগরিগুইও খুবই সতর্ক ফ্রান্স দল নিয়ে। তার মতে, ‘আমরা কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়তে যাচ্ছি। তবে আমরা যেভাবে খেলে যাচ্ছি তা ধরে রাখতে পারলেই হবে। ফরাসিদের ফরোয়ার্ড লাইনের ভরসা এমবাপ্পে। কাতার বিশ্বকাপে ৫ গোল দিয়ে রয়েছেন গোলদাতার তালিকায় সবার ওপরে। তবে আফ্রিকান দেশটির কোচ শুধু এমবাপ্পেকে নিয়ে বাড়তি পরিকল্পনা করছেন না। জানান, আমরা শুধু এমবাপ্পেকে নিয়ে ছক কষছি না। পুরো ফরাসি দলই বিপজ্জনক। গ্রিজম্যান, জিরুড ও ওসমানু দেম্বেলেরা গড়ে দিতে পারে পার্থক্য। তাই সবাইকেই নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা। দলের অন্য ফুটবলারদের মতো কোচ ওয়ালিদ রেগরিগুইও ফ্রান্স ও মরক্কোর নাগরিক। এই প্রসঙ্গে রেগরিগুইয়ের জবাব, আমি এখন মরক্কো জাতীয় দলের কোচ। আমার কাছে মরক্কোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের ম্যাচে দর্শকটাও একটা বড় বিষয়। ৩০-৪০ হাজার মরোক্কান সমর্থকের দখলে থাকবে স্টেডিয়াম। এটাতে বিশাল অনুপ্রেরণা বলে উল্লেখ করলেন কোচ রেগরিগুই। ফ্রান্সের কোচও এটাকে প্রতিপক্ষের বাড়তি শক্তি বলে জানান।
ফ্রান্স তাদের ৯ বিশ্বকাপ মিশনে এ নিয়ে ৬ বার সেমিফাইনালে খেলছে। ১৯৯৮ সালের ব্রাজিলের পর ফ্রান্স প্রথম দল যারা আগেরবারের বিশ্বকাপ জেতা দল হিসেবে খেলছে সেমিতে। উল্লেখ্য, ব্রাজিল ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দল। নক-আউট পর্বে ফ্রান্স তাদের ১৭ ম্যাচের ১৫টিতেই জিতেছে (টাইব্রেকারসহ)। এই দলটি গত ছয় নক আউট ম্যাচের একটিতেও হারেনি।
মরক্কো হলো ইউরোপ ও ল্যাতিন আমেরিকার বাইরে তৃতীয় দল, যারা সেমিতে খেলছে। এর আগে ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সেমিতে খেলেছিল। মরক্কো হলো প্রথম দল যারা আগে কখনোই সেমিতে খেলার অভিজ্ঞতা না নিয়েই এবার সেমিতে খেলছে। আর বিশ্বকাপের ২৫তম সেমিফাইনালিস্ট দল তারা। মরক্কো বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে (গত বিশ্বকাপসহ) অপরাজিত থাকা দল। বিশ্বকাপে এটাই তাদের বেশি ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
‘বিশ্বকাপ জিততে এসেছে মরক্কো’
‘সেমিফাইনালে শুধু খেলেই সন্তুষ্টি খুঁজছি না আমরা। আমাদের লক্ষ্য এখন বিশ্বকাপ জয়।’ গতকাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরিগুইয়ের এই বক্তব্যে বিস্মিত হয়নি অনেকেই।...



