দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরতে পারছেনা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দিনে দিনে অভিযোগের পাহাড় জমছে, তবে সে তুলনায় তৎপরতা কমেছে দুদকের। একই সাথে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে আলোচিত-সমালোচিত দুর্নীতিবাজ তথা দুর্নীতির রাঘব বোয়ালরা।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করলেও নানা কৌশলে দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতি থেমে নেই। তবে দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরার মতো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি দুদকের। গত ২০২১ সালের তুলনায় গত বছর (২০২২ সাল) দুদকে অভিযোগের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়লেও দায়ের করা মামলা ও চার্জশিটের হার কমেছে। আসামির তালিকায় নেই আলোচিত বড় কোনো দুর্নীতিবাজ।
দুদকের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় ১৭ হাজার। অভিযোগ যাচাই- বাছাই শেষে ৩৫৪টি বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ৩১২টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি হয়েছে। অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ায় দুদক সম্পদের নোটিশ জারি করেছে ৮৯টি। অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ২৭৬টি মামলা করেছে দুদক। পাশাপাশি ১৬২টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এছাড়া ৭৮টি মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
অথচ ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দুদকে অভিযোগ জমা পড়েছিল প্রায় সাড়ে ১২ হাজার। সে তুলনায় গত বছর (২০২২ সাল) এর হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
ওই সময়ে (২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত) ৩২৬টি অভিযোগের অনুসন্ধান করে দুদক। ২৪৪টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ায় দুদক সম্পদের নোটিশ জারি করে ১৯৩টি। অভিযোগের অনুসন্ধান শেষে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৩১১টি মামলা দায়ের করে দুদক। পাশাপাশি ২২২টি মামলার চার্জশিটও দেয়া হয়। অন্য দিকে, ৮০টি এফআরটির (মামলা থেকে অব্যাহতি) ঘটনা ঘটে।
২০০৪ সালে গঠিত কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। এরপর যথাক্রমে সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, গোলাম রহমান, মো: বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ ও মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। কিন্তু দুদকের ভাবমর্যাদা তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও বর্তমান কমিশনার ড. মো: মোজাম্মেল হক দুদককে একটি কার্যকর এবং দুর্নীতিবাজদের জন্য ভীতিকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করেন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুদক নখ-দন্তহীন বাঘ, এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে তেমন কিছু আশা করা যায় না এমন নেতিবাচক মন্তব্য শোনা গেলেও এখন সেই অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। এখন দুদক একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতিবাজদের জন্য একটি ভীতিকর প্রতিষ্ঠানও বটে।
তিনি বলেন, যারা দুর্নীতি করে, সহায়তা করে দুদকের নজরদারিতে তারা রয়েছেন। যারা অনুসন্ধান ও তদন্তের মধ্যে আছেন, তারা জানেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের ক্ষেত্রে দুদক কতটা হিংস্র। কাজেই দুদককে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দুদক একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানকে বাধা দেয়ার শক্তি কারো নেই। আশা করছি, দুদকের যে ম্যান্ডেট, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সেই লক্ষ্য যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে মানুষ দুদককে স্বাগত জানাবে।
দুদকের আলোচিত ঘটনা
অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কর্মকর্তা মো: শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণ করে আলোচিত-সমালোচিত হয় দুদক। গত বছরের (২০২২ সাল) ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদক (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা ২০০৮-এর বিধি ৫৪(২) ধারায় পটুয়াখালীর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনের অপসারণের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কোনো রকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এমন অপসারণ ও বিতর্কিত ৫৪(২) ধারা বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে দুদকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্দোলনের নামেন তার সহকর্মীরা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শরীফকে পুনর্বহালের দাবিতে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সংস্থাটির ২১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে একযোগে মানববন্ধন করেন তারা। একই সাথে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সই করা এক স্মারকলিপি সচিব বরাবর পেশ করা হয়।
স্মারকলিপিতে মো: শরিফ উদ্দীনকে দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এরপর দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে নানা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে গড়ায়। আজো শরীফ তার চাকরি ফিরে পাননি। এখনো বিষয়টি অমীমাংসিত অবস্থায় আছে।
ক্যাসিনো থেকে পি কে হালদার কেলেঙ্কারি
২০১৮ সালে ক্যাসিনো অভিযানের ধারাবাহিকতায় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার) বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করে দুদক। প্রায় ঝিমিয়ে পড়া কেলেঙ্কারির ঘটনাটি হঠাৎ চাঙা ও পুনরায় আলোচিত হয় যখন পি কে হালদার ভারতে গ্রেফতার হন। গত বছর ১৪ মে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোক নগরের একটি বাড়ি থেকে পাঁচ সহযোগীসহ পি কে হালদারকে গ্রেফতার করে। তাকে ফেরাতে দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হয়। কিন্তু আইনি জটিলতায় বিষয়টি এখনো আটকে আছে।
পি কে হালদারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪৪টি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের অর্থ আত্মসাতের ২৩টি মামলা এবং এফএএস লিজিংয়ের অর্থ আত্মসাতের ১৩টি মামলা রয়েছে।
৪২৬ কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় ছয় হাজার ৮০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগে পি কে হালদারসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে দুদক। অবৈধ সম্পদ অর্জন মামলার প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল হয় ২০২১ সালের নভেম্বরে।
আলোচিত পি কে হালদার কেলেঙ্কারিতে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন ১২ জন। তাদের মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী, পি কে হালদারের সহযোগী শংখ বেপারি, রাশেদুল হক, অবন্তিকা বড়াল ও নাহিদা রুনাইসহ আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।
বিপুল অর্থপাচার, তদন্ত করতে পারছে না দুদক
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অর্থপাচার বাড়ছে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। কেবল ২০১৫ সালে পাচার হয়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
কিন্তু বিদ্যমান মানিলন্ডারিং আইনে আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে না দুদক। অথচ মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অভিযোগের বড় দায় নিতে হয় দুদককে। কারণ হিসেবে দুদকের দাবি, বিদ্যমান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের মধ্যে শুধু একটির (দুর্নীতি ও ঘুষ) অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের। বাকিগুলো করছে সরকারের ছয়টি সংস্থা সিআইডি, এনবিআর, বিএসইসি, পরিবেশ অধিদফতর, বাংলাদেশ কাস্টমস ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের। অথচ ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের শুরুতে সব সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে উদ্ভূত মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান ও তদন্তের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ছিল দুদক।
এ কারণে তদন্তক্ষমতা পুনরায় ফিরে পেতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় দুদকের তফসিলভুক্ত যেকোনো অপরাধ অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতার বিষয়ে হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন চেয়েছে দুদক।
ক্ষমতা না থাকায় পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস, পেন্ডোরা পেপারস, মালয়েশিয়ার মাই সেকেন্ড হোম প্রকল্প, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অর্থপাচারের মতো অনুসন্ধান-তদন্ত করা যাচ্ছে না বলে দাবি দুদকের।
দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানতে পারছে না দুদক
দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরতে পারছেনা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দিনে দিনে অভিযোগের পাহাড় জমছে, তবে সে তুলনায় তৎপরতা কমেছে দুদকের। একই সাথে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে...



