আজ রমজানুল মোবারকের ২০ তারিখ। ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যবহ একটি ঘটনার সাক্ষী রমজানের ২০ তারিখ। শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার অধিকারী এ ঘটনাটি মক্কা বিজয়। ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের অষ্টম বছর মোতাবেক খ্রিষ্টীয় ৬৩০ সালে ১০ হাজার মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে প্রায় রক্তপাতহীনভাবে মক্কা নগরী জয় করেছিলেন এ দিনে। ইতিহাসে এই ঘটনা মক্কা বিজয় নামে খ্যাত হয়ে আছে এবং থাকবে।
ঐতিহাসিকদের মতে মক্কা বিজয় ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। যদিও কুরআন মাজিদে হুদাইবিয়ার সন্ধিকেই প্রকাশ্য বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয় দুটিই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতুলনীয় দূরদর্শিতার ফল বলে সাব্যস্ত করেন ঐতিহাসিকরা। তাদের মতে হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মুসলমানদের ও ইসলামের নবীর যে বিজয়ের সূচনা হয়, তার চূড়ান্ত রূপই ছিল মক্কা বিজয়।
হিজরি ষষ্ঠ বছরে সম্পাদিত এ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছিল মক্কার কুরাইশরা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিকার চেয়েছিলেন, নইলে সন্ধির সমাপ্তি হয়েছে মনে করার ঘোষণা দিয়ে ছিলেন। কুরাইশরা কোনো সাড়া না দেয়ায় তিনি অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। ২০ রমজান সকালে নবীজি সা: সাহাবায়ে কিরামের বিভিন্ন দলকে মক্কার বিভিন্ন দিক থেকে প্রবেশের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, কাউকে আক্রমণ করবে না। ইতঃপূর্বে ‘মুতা’ অভিযানেও তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনো সাধুসন্ন্যাসীকে হত্যা করবে না, বালক-বালিকা ও শিশুদের হত্যা করবে না, নারীদের হত্যা করবে না, বৃক্ষনিধন করবে না, শস্যক্ষেত্র ধ্বংস করবে না, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করবে না এবং আত্মসমর্পণকারীকে আঘাত করবে না। পরিকল্পনা করা হয়, পেছন দিক থেকে একদল যোদ্ধা প্রবেশ করবে । এই দলের সেনাপতি করা হলো হজরত খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা:) কে । সামনের দিক থেকে প্রবেশ করবে আরেক দল । এই দলের পরিচালনায় থাকলেন আল্লাহর রাসূল সা: নিজেই। হজরত খালেদ (রাঃ)-এর বাহিনীর সাথে ছোট্ট একটি সংঘর্ষ হয় । একদল মুশরিক তীর ছুড়ে তিনজন মুসলিমকে শহীদ করে। মুসলমানদের পাল্টা আক্রমণে মুশরিকদের ১৩ জন প্রাণ হারায় । বাকিরা পালিয়ে যায় । আল্লাহর রাসূলের পরিচালিত বাহিনীর সামনে আসেনি কেউ । ফলে বিনা বাধায় মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত উসামা ইবনে জায়েদ রাজিয়াল্লাহু আনহুর সাথে উটে চড়ে অবনত মস্তকে সবার শেষে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীকে নিয়ে একটি সভা করলেন। সেখানে দেয়া ভাষণে তিনি সাম্য, মৈত্রী ও একতার কথা বললেন: ‘হে কুরাইশরা! অতীতের সব ভ্রান্ত ধারণা মন থেকে মুছে ফেলো, কৌলীন্যের গর্ব ভুলে যাও, সবাই এক হও। সব মানুষ সমান, এ কথা বিশ্বাস করো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে-ই বেশি সম্মানিত, যে বেশি মুত্তাকি’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১৩)। এভাবে প্রায় রক্তপাতহীন সেই অভিযানে ইসলামের নবীর পতাকা সেখানে সমুন্নত হয়। আর সত্য ধর্মের গৌরব প্রতিষ্ঠিত হয় আরবের সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরীতে। হজরত ইবরাহিম খলিল আলাইহিস সালাম একক প্রভুর ইবাদতের জন্য যে বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন, তা ভরে ফেলা হয়েছিল মূর্তি ও বিগ্রহে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর ঘর থেকে ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করেন। আর এত দিন যারা ইসলামের শত্রুতায় সদা প্রস্তুত ছিল, তাদের জন্য ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। শান্তি ও মানবতার অনন্য নজির স্থাপন করলেন ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । তাই মক্কা বিজয়ের ঘটনা বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। আর সে কারণেই ২০ রমজান মুসলমানদের জন্য বিপুল গৌরবের স্মারক।



