রমজানুল মোবারকের আজ একুশ তারিখ। শুরু হয়েছে রমজানের শেষ দশক। মাহে রমজান উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সম্প্রীতি ও সমবেদনার অমিয় শিক্ষা নিয়ে উপস্থিত হয়। রমজানের শেষে ঈদ উৎসবে যেন সচ্ছল পরিবারের সাথে অভাবী পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিতে পারে সে দিকে লক্ষ রাখতে বলা হয়েছে বিশেষভাবে। ঈদের আগে সদাকাতুল ফিতর আদায়ের বিধান আনন্দ উৎসবে সবাইকে শরিক করে নেয়ার অনুপম ব্যবস্থা। তেমনি গোটা মাসের রোজা পালনে যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে যায়, তার প্রতিকার এই সদকা। এ জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে রোজার পরিশুদ্ধি ও অভাবীদের খাবার বলে আখ্যায়িত করেছেন। রমজানের শেষ দশকে মুসলিম সমাজে এই আর্থিক কর্তব্যটি পালনে আন্তরিক উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য সদাকাতুল ফিতর আদায়ের আরো তাৎপর্য রয়েছে। রমজানের রোজা শেষ করে ঈদ সামনে রেখে আদায় করতে হয় বলে এই ইবাদতটির নাম সদাকাতুল ফিতর।


আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। গোটা মাস পানাহার ও কামাচার বর্জন এবং পাপাচার পরিহার করে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। নাতিদীর্ঘ কালব্যাপী এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারা আল্লাহ তায়ালার তাওফিকেই সম্ভব হয়। তাই যখন পবিত্র মাস শেষ হয়ে আসে, তখন আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ ও তাওফিকের জন্য তার শোকর আদায় করা মুমিনের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সামান্য পরিমাণে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে মুমিন বান্দারা কষ্টকর ইবাদতটি পালনে সক্ষমতাদানের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত আছে- একবার তিনি রমজানের শেষ দিকে লোকদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা তোমাদের সিয়ামের সাদাকা দাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের প্রত্যেক মুসলিম, স্বাধীন-অধীন, পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড় সবার পক্ষে খেজুর বা যবের ‘এক সা’ অথবা ‘অর্ধ সা’ গম সদাকাতুল ফিতর ফরজ করে দিয়েছেন (আবূ দাউদ ও নাসায়ী শরীফ)।
হজরত ইবনু ‘আব্বাস (রা:) হতে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওমকে অযথা কথা, খারাপ আলাপ-আলোচনা থেকে পবিত্র করার ও গরিব মিসকিনকে খাদ্যবস্তু দেয়ার উদ্দেশ্যে সদাকায়ে ফিতর ফরজ করে দিয়েছেন (আবূ দাঊদ শরীফ)।


তেমনি আবদুল্লাহ ইবনু সা’লাবাহ্ অথবা সা’লাবাহ্ ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ সু’আয়র তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : এক সা’ গম প্রত্যেক দু’ ব্যক্তির পক্ষ হতে। ছোট কিংবা বড়, আজাদ গোলাম, পুরুষ অথবা নারী। তোমাদের মধ্যে যে ধনী তাকে আল্লাহ এর দ্বারা পবিত্র করবেন। কিন্তু যে গরিব তাকে আল্লাহ ফেরত দেবেন, যা সে দিয়েছিল তার চেয়ে অধিক (আবূ দাঊদ)।
সদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব বা অবশ্য কর্তব্য। তবে এ জন্য সক্ষমতার মাপকাঠি রয়েছে। কারো কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা সমমূল্যের সম্পদ থাকলে তার ওপর ওয়াজিব হয় সদাকাতুল ফিতর আদায় করা। জাকাতের সাথে পার্থক্য এই যে, জাকাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া ও এক বছর স্থিতিশীল থাকা শর্ত। কিন্তু সদাকাতুল ফিতরের বেলায় এ দুটি শর্ত নেই। এ জন্য কারো কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্থাবর ও অনুৎপাদনশীল সম্পদ থাকলেও এবং শুধু ঈদুল ফিতরের দিনটিতে থাকলেই তাকে সদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।


যার বা যাদের ওপর সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয়, তিনি বা তারাও তা দিতে পারেন। এ জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা এটির জন্য অনেকগুণ বদলা দেবেন। এটা আদায় করতে হয় নিজের ও নিজের পোষ্যদের পক্ষ থেকে। সর্বনিম্ন এক কেজি ৬৫০ গ্রাম আটা বা তার মূল্য মাথাপিছু সদাকাতুল ফিতর। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ১১৫ টাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এটা ন্যূনতম কর্তব্য। কেউ যদি বেশি পরিমাণে দান করেন তাতে দোষ তো নেই-ই বরং তা প্রশংসাযোগ্য। দায়মুক্ত হওয়ার জন্য নিম্নতম পরিমাণটি নির্ধারণ করা হয়েছে আদায়কারীদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি বজায় রেখে। অতিরিক্ত আদায় নফল বা ঐচ্ছিক সাব্যস্ত করা হয়েছে এ যুক্তিতে। নিঃস্ব, দরিদ্র আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে এ অর্থ পৌঁছে দেয়া কর্তব্য। ঈদের নামাজে রওনা হওয়ার আগেই সদাকাতুল ফিতর আদায় করা কর্তব্য। কেউ তাতে ব্যর্থ হলে ঈদের নামাজের পরে আদায় করতে হবে। সেবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যয় ও স্থাপনা নির্মাণ বা আসবাবপত্র খরিদের খাতে সদাকাতুল ফিতর ও জাকাতের অর্থ দেয়া যায় না। তবে এতিম, দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য তা দেয়া যাবে। এ জন্যই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে জাকাত ও সদাকাতুল ফিতর দান করার সুযোগ রয়েছে। যেকোনো ইবাদতে ঈমান, ইহতিসাব ও ইখলাস বিবেচ্য। সদাকাতুল ফিতর আদায়ের সময়ও আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনকে প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করলে ছওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।