বন্ধ হয়নি জাল ব্যান্ডরোলে বিড়ির ব্যবসা। দীর্ঘদিন ধরে অসাধু সিন্ডিকেট এ ধরনের জাল জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ার মতো নয়। মাঝে মাঝে সংশ্লিষ্ট দফতর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জাল ব্যান্ডরোল উদ্ধার করলেও বন্ধ হয়নি অবৈধভাবে পরিচালিত এই বিড়ির ব্যবসা।
এ ব্যাপারে ভ্যাট ট্যাক্স ও কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের তেমন তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ জালিয়াতচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই বিড়ি শিল্প থেকে সরকার বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারে বলে বিড়ি শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিড়ির অবৈধ ব্যবসা বন্ধের জন্য গত বছর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে বিড়ি/ সিগারেটের অবৈধ কারখানা কেন বন্ধ ঘোষণা করা হবে না, এই মর্মে একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। আইন ভঙ্গ করে কার্যক্রম চালানো বিড়ি-সিগারেটের কারখানা অবিলম্বে চিহ্নিত ও বন্ধ করতে এবং সেসব কারখানায় উৎপাদিত তামাকপণ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী জব্দে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক, ন্যাশনাল টোব্যাকো কন্ট্রোল সেলের সমন্বয়ক, প্রধান বয়লার পরিদর্শক এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের মহাপরিদর্শকের প্রতি এ নির্দেশ দিয়েছেন। আইন ও বিধিবিধান না মেনে বিড়ি-সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
সূত্র জানায়, সরকার প্রায় ৭২টি বিড়ি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেছে। এসব কোম্পানির বিড়ি বিভিন্ন মার্কেটে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগে বিভিন্ন হাট-বাজারে বিভিন্ন নামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ভুয়া কোম্পানির বিড়ি প্যাকেটের গায়ে জাল ব্যান্ড লাগিয়ে উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে দিনাজপুর, রংপুরের বিভিন্ন মার্কেটে বিড়ি বিক্রি করে বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। জানা গেছে, সারা দেশে বিড়ি শিল্পের চিত্র একই রকম।


বিড়ি শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানায়, সরকার ভ্যাট-ট্যাক্সসহ বিড়ি প্রতি প্যাকেটের মূল্য নির্ধারণ করেছে ১৮ টাকা। কিন্তু ভুয়া কোম্পানিগুলোর বিড়ি প্যাকেটে জাল ব্যান্ডরোল লাগানো থাকে। তার মূল্য ৯ টাকা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত বিড়ি কোম্পানিগুলো। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের ৮ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হাটবাজারে জাল ব্যান্ডরোল যুক্ত বিড়ি ও লাইসেন্সবিহীন বিড়ি বাজারজাত বা বিপণন করে আসছে। তবে এ ধরনের বিভিন্ন কোম্পানি বিড়ি বিক্রয় করে আসছে নামে-বেনামে। বিড়ি কারখানার মালিকরা বলছেন, রংপুর বিভাগে মাত্র তিনটি বিড়ি কোম্পানি ব্যতীত অন্যান্য কোম্পানিগুলো সরকারের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ব্যান্ডরোল ফাঁকিসহ নানান অনিয়মের মধ্য দিয়ে ব্যবসা করে আসছে। যার বিপরীতে শুধু রংপুর বিভাগ থেকে প্রতি বছর সরকার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
প্রকৃত বিড়ি কোম্পানি সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ১৮ টাকায় বিড়ি বিক্রি করছে। সেখানে অন্যান্য বিড়ির কোম্পানিগুলো ৬ থেকে ৯ টাকা মূল্যে প্রতি প্যাকেট বিড়ি বিক্রি করে আসছে। এ ছাড়া অনেক নামি-দামি বিড়ি কোম্পানি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ৬ থেকে ৮ টাকায় প্রতি প্যাকেট বিড়ি বিক্রি করছে।


জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাঠ পর্যায় গিয়ে মনিটরিং করলে সত্যতা পাবে বলে দাবি করেছে রংপুর জেলা বিড়ি মালিক সমিতি। তারা জানায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪ হাজার বিড়ি কোম্পানি রয়েছে। শুধু রংপুর বিভাগে ৪ শতাধিক বিড়ি কোম্পানি অনুমোদন রয়েছে।
সূত্র জানায়- ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে বিড়ি শিল্প থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ হাজার ৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। দেশে সব বিড়ি কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে রাজস্ব প্রদান করলে রাজস্বের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
লাইসেন্সবিহীন ও ব্যান্ডরোল ফাঁকি দেয়া বিড়ি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক তদারকি করার সুযোগ রয়েছে বলে রংপুর জেলা বিড়ি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম ডিনার জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে মাত্র দুটি পেপার মিল বিড়ি তৈরির কাগজ উৎপাদন করে। বিড়ি কোম্পানির অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে- বিড়ি তৈরির কাগজ উৎপাদনকারীর প্রতিষ্ঠান দুটিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে রাখা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তত্ত্বাবধানে উৎপাদিত বিড়ি তৈরির কাগজের সাথে বিড়ির ওপর সরকার নির্ধারিত ব্যান্ডরোল ৯ টাকা ৬৪ পয়সা একত্রিত করলে বা পোস্ট অফিস থেকে উত্তোলনকৃত ব্যান্ডরোল প্রত্যাহার করে সরাসরি বিড়ি তৈরির কাগজের সাথে নির্ধারণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ হলে বা সম্পৃক্ত করে দেয়া হলে, বিড়ি সেক্টরে শতভাগ দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। একই সাথে কম মূল্যে বা জাল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে বিড়ি কোম্পানিগুলোর ৬ টাকা ৮ টাকায় বিড়ি বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।


তিনি আরো বলেন, পোস্ট অফিস থেকে বিড়ির ব্যান্ডরোল সংগ্রহ করতে হয়, অপর দিকে বিড়ি তৈরির কাগজ দুটি মিল থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এতে করে বিভিন্ন ধরনের শুভংকরের ফাঁকির সুযোগ রয়েই যায়। একদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা তাদের বিড়ির ফ্যাক্টরি লোকসান দিয়ে বন্ধের মুখে পড়ছে, অন্যদিকে ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আসছে একশ্রেণীর অসৎ ব্যবসায়ী। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে বিড়ি তৈরির কাগজের উপর সরকারের ৯ টাকা ৬৪ পয়সার ব্যান্ডরোলের এই মূল্যটি লাগিয়ে দিলে দুর্নীতি বন্ধ হবে।
তরিকুল ইসলাম ডিনার জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড উপরোক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করলে সরকারের নির্ধারিত মূল্য অর্থাৎ ১৮ টাকার নিচে কোনো বিড়ি বিক্রয় করতে পারবে না। এতে জাল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে অবৈধভাবে বিড়ি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। একই সাথে বিড়ি সেক্টরে জাল ব্যান্ডরোলের ব্যবসা, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ সব অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ হয়ে আসবে। এতে প্রতিষ্ঠিত বিড়ি কোম্পানি সরকারকে কোটি কোটি টাকা ভ্যাট ট্যাক্স প্রদান করতে পারবে। নয়তো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রতি বছর সরকার হারাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব যা রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
মালিক সমিতির এই নেতা জানান, এ ধরনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে। এছাড়া বর্তমান ট্যারিফ মূল্য ১৮ অব্যাহত রেখে ট্যাক্স আহরণ উত্তম হবে। বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কঠোরভাবে তদারকি করলে এই খাতে রাজস্ব যথাযথ বৃদ্ধি পাবে।