১২ জুন বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এটি সিটির পঞ্চম নির্বাচন। বিগত চারটি নির্বাচনের ফলাফলে দুই বার বিএনপি এবং দুই বার আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অনেক এলাকায় ভোটকেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে সিল মারার অভিযোগ আনেন প্রতিদ্বন্দ্বী সব মেয়র প্রার্থী। এই অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে ভোট বর্জন করেন তারা। বিগত নির্বাচনের বাজে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এবারের নির্বাচনে অংশ নেননি বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা: মনীষা চক্রবর্তী। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপির অনেক প্রমাণ গণমাধ্যমে তুলে ধরেন।
গত চারটি সিটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখানে বরাবরই বিএনপির ভোট অনেক বেশি। এ কারণে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর মাঝেও বিএনপিকে জয়ী হতে দেখা গেছে। ইভিএমের কারণে গাজীপুরের মতো বরিশালেও এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলেই মনে করছেন বরিশালের ভোটাররা। তা ছাড়া সরকারের বর্তমান সার্বিক অবস্থা ও ইসির কঠোর মনোভাব দেখে ভোটারদের পাশাপাশি প্রার্থীরাও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে অনেকটাই আশাবাদী।
এদিকে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে সরব প্রচারণায় মাঠ সরগরম করেছেন প্রার্থীরা। বিশেষ করে মেয়র প্রার্থীরা প্রচারণার মাঠে ব্যাপক সরব। বেলা ২টার পর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের শত শত প্রচার মাইকের আওয়াজে ভোটারদের কান ঝালাপালা হয়ে ওঠে। অবশ্য শনিবার রাত ১২টার পর থেকে তারা এ ধরনের শব্দ তরঙ্গ আর বাহারী প্যারোডি গান বাজনার মজাদার খোরাক আর পাচ্ছেন না।

বরিশাল নগরীতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রচারণা চলছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। মেয়র প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ওরফে খোকন সেরনিয়াবাতের পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, মাইকিং সব কিছুতেই ছেয়ে গেছে পুরো নগরী। বরিশালের স্থানীয় পত্রিকাগুলোর অধিকাংশই নৌকার প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাতের বিজ্ঞাপন আর বন্দনায় ভরপুর। আওয়ামী লীগের মাইকিং গণসংযোগ এত বেশি যে, নতুন কোনো আগন্তুকের কাছে পুরো নগরীকেই নৌকাময় মনে হবে। এত প্রচারণার পরও নগরীর অনেক ভোটারের মন্তব্য ‘যত গর্জে, তত বর্ষে না’। তাদের এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে- যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নৌকার জন্য ভোট চাইছেন, গণসংযোগ করছেন তাদের অধিকাংশই বরিশালের ভোটার নন। কেন্দ্রীয় ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা নগরীতে এসে খোকন সেরনিয়াবাতের নৌকার পক্ষে সক্রিয়ভাবে ভোট চাইছেন। কিন্তু বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পদধারী অনেক নেতাকেই নির্বাচনের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও সাদিক আবদুল্লাহর অনেক ঘনিষ্ঠ অনুসারী নির্বাচনের মাঠে নেই। সম্প্রতি গৌরনদীতে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও আবুল খায়ের আবদুল্লাহর কোলাকুলির দৃশ্য গণমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেললেও বাস্তবে কোনো ‘বরফ গলেনি’ বরিশালে নৌকার ভোটের রাজনীতিতে।

একদিকে বরিশালে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের তুলনামূলক ভোট অনেক কম, অন্যদিকে সাদিক আবদুল্লাহর নেগেটিভ কর্মকাণ্ড ও উন্নয়ন করতে না পারার ব্যর্থতা, বিপরীতে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের গ্রুপিং সব মিলিয়ে সুষ্ঠু ভোট হলে ‘উপরে সরব আর ভেতরে টেনশন’ নিয়েই থাকতে হচ্ছে নৌকার প্রার্থীকে।
বরিশালে বাহ্যিকভাবে ভোটের মাঠে দ্বিতীয় অবস্থানে অর্থাৎ নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখাকে। তারাও প্রচারণায় সরব। তাদের কর্মীরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নিঃস্বার্থভাবে দলের জন্য কাজ করছেন। প্রচার মাইকিংয়ে রেকর্ড করা কোরাস গান গেয়ে নগরী কাপাচ্ছেন ‘কলরব’র শিল্পীরা, ঢাকা থেকে আসা জনপ্রিয় নাশিদ শিল্পীদেরও হাতপাখার পক্ষে নগরীর কাঠপট্টি এলাকায় ভোট চাইতে দেখা গেছে। কিন্তু এসব প্রচার কাজে নিয়োজিতদের অনেকেই নগরীর ভোটার নন। কেন্দ্রসহ বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা, বিশেষ করে চরমোনাই মাদরাসা থেকে আসা কর্মীরাই মূলত তাদের প্রধান প্রচারকর্মী। বরিশালের চরমোনাই ইউনিয়নে ইসলামী আন্দোলনের ভোট ব্যাংক থাকলেও নগরীতে তাদের খুব বেশি রিজার্ভ ভোট নেই। এ কারণে তাদের প্রধান ভরসা বিএনপির ভোট ব্যাংক। তবে হাতপাখার মেয়রপ্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বিএনপির নারী ভোটারদের বেশ কিছু ভোট পাবেন, কিন্তু বিএনপির পুরুষ ভোটারদের ভোট তেমন পাবেন না। কারণ সচেতন বিএনপি কর্মীরা ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে চরমোনাই ইউনিয়নে দলের বর্তমান যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ারের উপর হামলার কথা এখনো ভুলতে পারেননি।

প্রচারণায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসেন তাপস। তিনি লাঙল প্রতীক নিয়ে ২০১৮ সালেও নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু সেই নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ায় তার অবস্থান স্পষ্ট বোঝা যায়নি। তবে সেই থেকে তিনি নিয়মিত বরিশালের জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন। যাবতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় তিনি একাই বহন করেছেন। সাউথ অ্যাপোলো মেডিক্যাল কলেজ, সাউথ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিকসহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত রয়েছেন তিনি। এছাড়াও প্রতিষ্ঠা করেছেন বরিশাল ফর এভার লিভিং সোসাইটি। এই সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তিনি বরিশাল নগরীর অনেক গরিব নারী পুরুষকে বিনামূল্যে কম্পিউটার ট্রেনিং ও সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলস্বী করেছেন। এবারের নির্বাচনে সুবিধাভোগী এসব মানুষ তার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ইকবাল হোসেন তাপস আওয়ামী লীগের ‘অভ্যন্তরীণ’ কিছু ভোট পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাপসের আপন ছোট ভাই এ এইচ এম তসলিম বরিশাল জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিএনপি ঘরানার বেশ কিছু ভোট টানতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপরদিকে দল থেকে বহিষ্কার আদেশের পর যেন অনেকটাই স্বাচ্ছন্দে প্রচারণার মাঠে রয়েছেন বিএনপি পরিবারের সন্তান ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপন। তিনি টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য কামরুল আহসান রুপন বর্তমানে দলের কোনো পদে না থাকলেও তাকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার আদেশ দেয়াটা অনেকটা ছায়া প্রার্থীর ঘোষণা দেয়ার মতো বলে মনে করছেন বিএনপি কর্মীরা। নগরের বাসিন্দা ও ভোটার জাকারিয়া খান বলেন, যে স্কুলের ছাত্রই আমি না, সেই স্কুল থেকে যদি টিসি দেয়া হয় তাহলে বিষয়টি কেমন দাঁড়ায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে যখন বরিশাল মহানগরের নেতারা চাউর করেছে রুপন তাদের কেউ না, সেখানে বিএনপির বহিষ্কার আদেশের মধ্য দিয়ে রুপনের বিষয়ে কী জানান দেয়া হলো? সাধারণ নাগরিক হিসেবে চিন্তা করলে বলতে হয়, রুপন যে বিএনপির ছিল সেটার স্বীকৃতিই বহিষ্কারের আদেশ। এ ছাড়া রুপনের বাবা মরহুম আহসান হাবিব কামালের সারা বরিশালেই কিছু সমর্থক রয়েছে। কারণ তিনি সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। এ ক্ষেত্রে আহসান হাবিব কামালের ভোটগুলোও রুপন পেতে পারে। সব মিলিয়ে রুপন অনেক ভোট পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথেই নির্বাচনে ভোটযুদ্ধ হবে বলে মনে করেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিছুর রহমান স্বপন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন অথবা জাতীয় পার্টি হবে। তবে মূল শহরের ভেতরটাতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী তাপসের অবস্থানটা ভালো, যা নেই ইসলামী আন্দোলনের। যদিও বর্ধিত এলাকায় ইসলামী আন্দোলনের ভোট রয়েছে। এদিকে সাদামাটা স্বভাবের তাপসের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট শিক্ষক নেতা মহসিন উল ইসলাম হাবুলের জনপ্রিয়তাও কাজে লাগছে তাপসের ক্ষেত্রে। এটা বড় ফ্যাক্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে, যার সুবিধা ভোটের দিনও পাবেন তাপস। সেক্ষেত্রে ভোটে তাপসই ক্ষমতাসীনদের সাথে লড়াই করবেন বলে মত তার। তিনি বলেন, এর বাইরে রুপন বিএনপি পরিবারের সদস্য হলেও তিনি তার বাবার অবস্থানে আসেননি এখনো। তবে তার বাবার বেশ ু কিছু ভোট তিনি পাবেন।
জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের নেতা পর্যায়ের লোকেরা ভোট কেন্দ্রে যাবেন না, শুধু যেসব এলাকায় জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচন করছেন সেখানে তারা কাউন্সিলর প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। মেয়র পদে তারা নৌকা ও হাত পাখাকে কোনো ভোট দিবেন না। সেক্ষেত্রে তাদের ভোট জাতীয় পার্টির ডানপন্থী প্রার্থী হিসেবে ইকবাল হোসেন তাপসের লাঙল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আহসান রুপনের টেবিল ঘড়ির দিকে যেতে পারে।
কেন্দ্র ও কক্ষে সিসি ক্যামেরা : বরিশাল সিটি নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল দায়িত্ব পালনের জন্য ৩০ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১০ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। তারা নগরীর ৩০ ওয়ার্ডে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের তাৎক্ষণিক বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বলে জানিয়েছেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মিডিয়া সমন্বয়ক মো: মনিরুজ্জামান। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে দু’টি এবং প্রত্যেক কক্ষে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে।