বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন নয় মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই সরকার বৈধ নয়। এরা অবৈধ। তাদের অধীনে কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আমাদের স্পষ্ট কথা আমরা এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবো না। আমরা নির্বাচন চাই। সেটা হতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। আমাদের ‘দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’। তবেই সাম্য ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সরকারের অন্যায় দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে কিন্তু র্যাবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এটা আমাদের জন্য সুখকর নয়।
গতকাল শনিবার বিকেলে বরিশাল নগরীর বেলস্ পার্কে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত তারুণ্যের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার ও শিক্ষা উপকরণের দাম কমানোসহ বিভিন্ন দাবিতে এই সমাবেশ হয়। কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে বেলস পার্ক মাঠে বিকেল ৪টায় কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় সমাবেশ। সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, সংবিধান অনুযায়ী এই সরকার বৈধ নয়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জনগণের দাবি মেনে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে হরতাল করেছিল। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। কোনো সমস্যা হয়নি। অথচ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছে শুধু ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে। এর মাধ্যমে দেশে সঙ্কটকে দীর্ঘ করেছে সরকার।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও বিদায়ের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। যার প্রমাণ বরিশালে তারুণ্যের সমাবেশ। তিনি বলেন, আজকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের নতুন সংগ্রাম চলছে। এরা আমাদের ইলিয়াস আলী, সুমন থেকে শুরু করে ছয় শতাধিক নেতাকর্মীকে গুম করেছে। তাদের সন্তানেরা এখনো অপেক্ষা করে তাদের বাবা-ভাই ফিরে আসবে। শুধু অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলে রাখতে গত ১৪ বছর ধরে তারা নির্যাতন করছে।
এ দিকে সমাবেশ উপলক্ষে সকাল থেকেই বেলস পার্কে জড়ো হন নেতাকর্মীরা। বরিশাল জেলা ও মহানগর, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা জেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আসা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দুপুরের মধ্যেই মাঠে জড়ো হন। তারা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিসহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহর পক্ষে একটি বিশাল মিছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিএনপির সভাপতি এবং জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমরানুল হক চাকলাদারের পক্ষ থেকে একটি মিছিল বিশাল এই সমাবেশে যোগ দেয়। তবে একই দিনে বেলস পার্ক থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নগর ভবন ও শহীদ মিনারের সামনে যুবলীগ পাল্টা শান্তি সমাবেশ করেছে। এ নিয়ে নগরজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তবে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণের সভাপতিত্বে ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিল্টন ও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলের পরিচালনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন- বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও মাহবুবুল হক নান্নু, বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবির জাহিদ, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক, ছাত্রদলের সহসভাপতি তানজিল হাসান, অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডিসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
এ ছাড়াও বিগত আন্দোলনে পুলিশ ও সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ভোলার আব্দুর রহিমের স্ত্রী খাদিজা বেগম, গুম হওয়া দুই সন্তান কালু মিয়া ও মিরাজ আহমেদের মা ফিরোজা বেগম, তরুণ সমাজের প্রতিনিধি জান্নাতুল উর্মি (ছাত্রী), রাতুল আহমেদ (চাকরিপ্রার্থী), আবুল কালাম আজাদ রিপন (চাকরিচ্যুত উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা), সাংবাদিক মামুনুর রশিদ নোমানী (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় কারাভোগী) বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার বলে দেশে নাকি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। তারা বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একজন মেয়রপ্রার্থী আলেম মানুষকে মেরেছে। আর সিইসি বলেন, ‘তিনি কি মারা গেছেন?’ এরা সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচনের কথা বলে; কিন্তু কোন সংবিধান? সংবিধানে তো বলা হয়েছে দেশের মালিক জনগণ। তারা কি ভোট দিতে পেরেছে? না। দুই প্রজন্ম ভোট দিতে পারেনি। অথচ ভোট দেয়া হয় প্রতিনিধি নির্বাচিত করার জন্য; কিন্তু এরা নিজের চুরি করার জন্য সংসদে পাঠায়। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখে বলে যে, ভোট হয়ে গেছে। কারণ তারা জানে জনমতের প্রতিফলন হলে তারা ১০টি আসনও পাবেন না। এত অন্যায় করেছে।
সুইস ব্যাংক থেকে টাকা সরানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অনেক টাকা জমা হয়েছিল; কিন্তু শেখ হাসিনা সুইজারল্যান্ড যাওয়ার পর শোনা গেল সুইস ব্যাংক থেকে বাংলাদেশীরা অনেক টাকা সরিয়ে ফেলেছে। লোকে এসব বলাবলি করে। আসলে সবাই এসব বোঝে। তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আজকে সরকার বিদ্যুতের কথা বলে; কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে প্রকল্প করে টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করা। আজকে সবধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে। কিন্তু সরকার আরাম আয়েশ করছে। এরা কাগজ-কলম, চাল-ডাল সবকিছুর দাম বাড়িয়েছে। এরা যতদিন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে এই অবস্থা চলতে থাকবে। বিএনপি মহাসচিব তরুণ সমাবেশের প্রশংসা করে বলেন, এই তরুণ সমাবেশের মাধ্যমে আমাদের সাহস বাড়ে। যেন তরুণ বয়সে ফিরে যাই, যা আমাদের অন্দোলিত করে। আজকে এই ফ্যাসিস্ট ও অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তারেক রহমানের স্বপ্ন তরুণ প্রজন্মকে দেখাতে হবে। এই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার আগে আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, চল্লিশ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ নতুন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ না করার কারণে অনেক মেধাবীর চাকরি হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বললে গুম-খুন করা হচ্ছে। জামালপুরে একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। কারণ তিনি আওয়ামী লীগের সত্য ঘটনা প্রকাশ করেছেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান বলেন, আমাদের তরুণ সমাবেশ ঘিরে সারা দেশে তরুণ প্রজন্মের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। কোনো বাধাবিপত্তি তরুণদেরকে দমাতে পারেনি। ইনশা আল্লাহ তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই বর্তমান অবৈধ সরকারের পতন ঘটাবে। ছাত্রদল সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, তরুণদের সাথে নিয়েই দেশের মানুষের ভোটাধিকারসহ দাবি আদায় করা হবে।
বরগুনা-বরিশাল বাস বন্ধ
বরগুনা প্রতিনিধি জানান, বরগুনা জেলা ও ছয়টি উপজেলা এবং চার পৌরসভার যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সমাবেশে যোগদান করতে বাস বুকিং করে রেখে ছিল; কিন্তু বরগুনা জেলা বাস মালিক সমিতি এ বিষয়টি জানতে পেরে আওয়ামী লীগের দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তা বন্ধ করে দেন। এ বিষয়টি দৈনিক নয়া দিগন্তকে নিশ্চিত করেছেন বরগুনা জেলা যুবদলের সভাপতি মো: জাহিদ হোসেন মোল্লা। তিনি শনিবার সকালে জানান, আমরা বরগুনা জেলা যুবদল এ সমাবেশে সতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে আগে থেকেই অগ্রিম টাকা দিয়ে ২৪টি বাস বুকিং করে রেখেছিলাম; কিন্তু বরগুনা বাস মালিক সমিতি আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বন্ধ করে দেন।
বরগুনা বাস মালিক শ্রমিক সমিতি সাধারণ সম্পাদক মো: শাহাবুদ্দিন সাবু বরিশাল-বরগুনা রুটের সব বাস চলাচল বন্ধ রাখার সত্যতা স্বীকার করেছেন।



