তহবিল সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। এর ফলে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক খাদ্য সহায়তা দাঁড়িয়েছে ৮৪০ টাকায়। আগে রোহিঙ্গারা মাসে এক হাজার ৫০ টাকা করে খাদ্য সহায়তা পেতো। জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে খাদ্য সহায়তা কমানোর বার্তা পাঠায়। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রোহিঙ্গারা। ১১ নং ক্যাম্পের সোলতান আহমদ বলেন, রোহিঙ্গাদের খাদ্য বরাদ্দ কমায় জীবনের তাগিদে কাজের সন্ধানে বেরুচ্ছে রোহিঙ্গারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তহবিল ঘাটতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্য সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে জাতিসঙ্ঘ। তহবিল ঘাটতির কারণে ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে ডব্লিউএফপি খাদ্য সহায়তা কাটছাঁট করছে। ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, সঙ্ঘাত, অর্থনৈতিক ধাক্কা, বিরূপ জলবায়ু এবং সারের দাম বৃদ্ধির ফলে খাদ্যসঙ্কট নজিরবিহীন আকার ধারণ করেছে। বর্তমান বিশ্বে ৮২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তাদের পরের বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে সে বিষয় নিশ্চিত নয়। ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, সঙ্ঘাত ক্ষুধা বাড়াচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশের বসবাস যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতময় এলাকায়। অন্য দিকে খাবারের খরচ সর্বকালের সর্বোচ্চ। বর্তমানে ডব্লিউএফপির মাসিক পরিচালনা ব্যয় ৭ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। এটি ২০১৯ সালের চেয়ে ৪৪ শতাংশ বেশি। আগে থেকে ক্ষুধার্তের তালিকায় থাকা ৪০ লাখ মানুষের খাবার জোগান দিতে ওই বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ক্ষুধার্তের তালিকায় নতুন করে যোগ হওয়া আরো মানুষের খাবার জোগান দিতে মাথাপিছু সহায়তার পরিমাণ কমাতে হচ্ছে ডব্লিউএফপিকে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরকালে এনএইচকে টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জ্বালানি ও খাদ্যের খরচ বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবির চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জাতিসঙ্ঘ খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। সেই সহায়তা কাটছাঁট হওয়ায় এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়েছে।

তহবিল সঙ্কটের কারণে জাতিসঙ্ঘ গত মার্চে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ১৭ শতাংশ কমিয়েছে। মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার টম অ্যান্ড্রুজ গত ২৮ এপ্রিল সতর্ক করেছিলেন, তহবিল না পেলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে আরো ২০ শতাংশ খাদ্য সহায়তা কমাতে হবে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির থেকে রোহিঙ্গা অধিকার কর্মী সাদেক হোসেন বলেন, ‘এই খাদ্য সহায়তা কমার প্রভাব হবে খুবই ভয়াবহ। ৮৪০ টাকার খাবারে একজন মানুষ কিভাবে এক মাস চলতে পারে?’ তিনি আরো বলেন, এ দেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জীবিকার সুযোগ নেই। তারা পুরোপুরি জাতিসঙ্ঘের খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তিনি খাদ্য সহায়তা কাটছাঁটের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসঙ্ঘের প্রতি আহ্বান জানান।
কক্সবাজারে ৩৩টি ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের খাদ্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। বরাদ্দ কমায় ক্যাম্পে দিন দিন বাড়ছে আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা। অর্থের জোগান দিতে নানা ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। এতে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও। সচেতন মহলের মতে সরকারের মানবিক সহায়তায় আশ্রিত ১২ লক্ষাধিক বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থ সঙ্কট দেখা দিলে ঘটতে পারে মহাবিপর্যয়। তাদের মতে এর একমাত্র সমাধান রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আমাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সসম্মানে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনই এ সঙ্কটের টেকসই সমাধান। আশা করি, মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। গত ১১ জুলাই মঙ্গলবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স অন পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সদস্য দেশসমূহের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গা সঙ্কটে ২০১৮ সাল থেকে সহায়তা করছে দাতা সংস্থাগুলো। কিন্তু এখন দাতা সংস্থা থেকে চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা মিলছে না বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ডব্লিউএফপি খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেয়ায় আরো জমাট বাঁধছে রোহিঙ্গা সঙ্কট। গত বুধবার ডব্লিউএফপির এক বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি বছর দুই দফা কমানো হয়েছে রোহিঙ্গাদের রেশন বরাদ্দ। প্রথম দফায় ১ মার্চ রেশন বরাদ্দ ১২ ডলার থেকে কমিয়ে করা হয় ১০ ডলার। দ্বিতীয় দফায় ১ জুন থেকে আরো ২ ডলার কমিয়ে এখন ৮ ডলারে নামিয়ে আনা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রেশন কমানোই তাদের শেষ অবলম্বন। অনেক দাতা তহবিল নিয়ে এগিয়ে এসেছেন কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা মানবিক সঙ্কট পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় ৮৭৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু মাত্র এক-চতুর্থাংশ অর্থায়ন পাওয়া গেছে।

এ দিকে খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেয়ায় চিন্তিত রোহিঙ্গারা। উখিয়ার ক্যাম্প-১ এর জামালিকা (২৫) বলেন, আমি গর্ভবতী নারী। এখন আমার বেশি বেশি খাওয়া উচিত। কিন্তু এখন খাওয়া-দাওয়া ঠিকভাবে করতে পারছি না। কারণ খাদ্য কমে গেছে, কোনো ধরনের পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছি না। পেটের বাচ্চা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি। আরেক রোহিঙ্গা মোহাম্মদ হোসন (৫৫) বলেন, ৮৪০ টাকার মধ্যে চাল পেয়েছি ১৩ কেজি, তেল পেয়েছি ১টি আর ১টি লবণের প্যাকেট পেয়েছি মাত্র। এখন কী করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা খালেদা বেগম (৪৮) বলেন, এই রেশন দিয়ে সংসার চলে না। এতে আমার স্বামী ও ছেলেরা ক্যাম্পের বাইরে কাজ করতে যেতে বাধ্য হয়। ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে মাসে ১০-১৫ দিন মজুরি দেয় তারা। ওই অর্থ দিয়ে সংসার চলে। যারা ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারে না, তাদের সংসার চলছে কষ্টে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কমেছে অর্থ বরাদ্দ। রোহিঙ্গারা আগে যে পরিমাণ রেশন পেতেন, এখন তা পাচ্ছেন না। এতে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোতে অর্থ সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে মিয়ানমারকে ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গার তালিকা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে মাত্র ৭০ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই করেছে মিয়ানমার। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি।