বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অভ্যন্তরে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। জালজালিয়াতি, অবৈধ লেনদেনসহ সবই চলছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে।
অভিযোগ উঠেছে- একজন মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এসব দুর্নীতির বিষয়ে বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভেযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতর থেকে অনুসন্ধান ও তদন্ত চলছে। একই সাথে দুদকের পক্ষ থেকেও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ইতোমধ্যে অভিযুক্তকে তলব করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, পিএস মো: আব্দুল ওয়াহেদ-এর সিন্ডিকেটের দুর্নীতির বিষয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৪ গুলশান আরা স্বাক্ষরিত এক পত্রের (যার স্মারক নম্বর- ০৩.০০.২৬৯০.০৭১.১৮.০০১. ২০২২-১৮) মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের দফতরে পাঠানো হয়। ওই পত্রে বলা হয়েছে, বিএসইসির অধীনস্থ প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: তৌহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রাপ্ত অভিযোগ নির্দেশক্রমে প্রেরণ করা হয়েছে। তার দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়ে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক এই কার্যালয়ে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুগ্ম সচিব মো: আব্দুল ওয়াহেদ গত ১৩-০২-২০২৩ থেকে ১২-০৫-২৩ পর্যন্ত সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময়ে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ছাড়াও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে অসদাচরণ করার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তিনি এমডি হওয়ার পর কিছু বিতর্কিত এজেন্ডা যা প্রগতির জন্য ক্ষতিকর, তা বোর্ডে উত্থাপন করা হলেও পাস করতে বাধা প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশিত হলে মন্ত্রণালয় তাকে প্রত্যাহার করে নেয়। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট্যান্ট মো: আজাদকে (নন টেকনিশিয়ান) প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের মতো একটি ব্র্যান্ড কোম্পানির এমডি হিসেবে নিয়োগ করেন। এ জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
অথচ ঊর্ধ্বতন আরো প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন ডিজিএম ও জিএম-এর মতো ইঞ্জিনিয়ার সেক্টেরে কর্মকর্তা রয়েছেন। তারপরও তাকে অবৈধভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ভুল তথ্য দিয়ে তাকে নিয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক মো: জসিম উদ্দিন রাজীব বলেন, বোর্ড সভায় নিয়মবহির্ভূত বিভিন্ন এজেন্ডা উত্থাপন করা হলে আমি তার বিরোধিতা করি। এ ক্ষেত্রে যুগ্ম সচিব আব্দুল ওয়াহেদ বাদ সাধেন।
এ কারণে তাকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এ ব্যাপারে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগসহ আইনি লড়াই করে যাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র জানায়, আব্দুল ওয়াহেদ তার ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটিয়ে উপ সচিব ও মন্ত্রীর পিএস পদে থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে প্রগতির তৎকালীন ৯৪ লাখ টাকা মূল্যমানের একটি নতুন পাজেরো স্পোর্ট জিপ গাড়ি কয়েক বছর ধরে ব্যবহার করেন। এরপর ওই গাড়িটি পরিবর্তন করে প্রগতির আরো একটি পাজেরো স্পোর্ট কিউএক্স জিপ ব্যবহার করছেন। তিনি প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের একটি পাজেরো স্পোর্ট জিপ (প্রগতির ড্রাইভার, জ্বালানি, মেইন্টেনেন্সসহ) ব্যবহার করে আসছেন।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর থেকে প্রগতির গাড়িটি ড্রাইভার, ফুয়েলসহ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ব্যবহার করে আসছেন। এতে গাড়ির ড্রাইভারের বেতনভাতা, ওভার টাইম, ফুয়েল ও মেইনটেনেন্সের টাকা প্রগতির অনুৎপাদনশীল খাতে অপব্যয় করে আসছেন। ফলে প্রগতির বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
অপর দিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি-মো: তৌহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নেয়াসহ বিভিন্ন দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হলেও তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
অপর দিকে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের অস্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত সচিব এস আলম তিন থেকে চার মাস দায়িত্ব পালন করেন। তাকে একটি দেড় কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি ৮০ লাখ টাকায় বিক্রি দেখিয়ে দেয়া হয়। অথচ প্রগতির অর্গানোগ্রামে কোনো জিপ গাড়ি কেনার বিধান নেই বলে জানা গেছে। তারপর আবার বোর্ড সভায় পাস না করিয়ে ওই গাড়িটি ক্রয় দেখিয়ে তাকে দেয়া হয়েছে, যা এখনো তিনি ব্যবহার করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছরের ৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব মো: নুরুল হক স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়েছে, মো: তৌহিদুজ্জামান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে মো: জসিম উদ্দিন রাজিব, পরিচালক, পিআইএল কোম্পানি বোর্ড-এর অভিযোগের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখায় জানানো হয় যে, মো: তৌহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ প্রাপ্তি ও মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি লাভ, বিধিবহির্ভূতভাবে একই সাথে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রগতি টাওয়ার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন, প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত গাড়ি ও গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার, ক্রয়কার্যে দুর্নীতি এবং ঘুষের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বদলি হওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
ওই পত্রে আরো বলা হয়েছে, মো: তৌহিদুজ্জামান, প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ব্লেøড ফ্যাক্টরি লিমিটেডের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। কিন্ত্র এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: তৌহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক অত্র কার্যালয়ে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে শিল্পমন্ত্রীর পিএস মো: আব্দুল ওয়াহেদের মোবাইল ফোনে ফোন করা হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করে কথা না বলেই কেটে দেন।