রাজধানীর মগবাজার ফ্লাইওভারের একটি রহস্যময় সুড়ঙ্গ থেকে তিন নারী ও এক পুরুষ ছিনতাইকারীকে আটকের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
রহস্যময় সুড়ঙ্গের বিষয় খতিয়ে দেখতে গিয়ে পুলিশ জানতে পেরেছে এটি মূলত ছিনতাইকারীদের একটি গোপন আস্তানা। পথচারীদের মালামাল বা মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা এখানে লুকিয়ে থাকত। একই সাথে তারা এটিকে মাদক সেবন ও অনৈতিক কাজের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। পুলিশ জানায়, দিনের পর দিন হাজার হাজার মানুষ মগবাজার ফ্লাইওভার ব্যবহার করলেও কেউ জানতে পারেনি এই গোপন সুড়ঙ্গের কথা। ফ্লাইওভারের মধ্যে অপরাধীদের বিচরণ ক্ষেত্র থাকার কথা ছিল সবার কল্পনার বাইরে। সেখানে ছিনতাইকারীরা টানা সাত দিনও অবস্থান করেছে। তাদের নারী সহযোগীরা খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করত।
হাতিরঝিল থানার ওসি শাহ মো: আওলাদ হোসেন বলেন, ফ্লাইওভারের নিচে পিলারের ওপরে গোপন আস্তানায় তারা ছোট একটি মই, পুরনো কম্বল ও রশি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গে ওঠানামা করত। তারা লোকচক্ষুর আড়ালে সেখানে দীর্ঘদিন থেকে ওঠানামা করে আসছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ জানায়, ফ্লাইওভারের নিচের খালি জায়গাকে গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে ছিনতাইকারীরা, এই জায়গাটি একটা সুড়ঙ্গের মতো। ছিনতাইয়ের পর এখানে তারা লুকিয়ে থাকে, আর ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়।
ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য আকবর পুলিশকে জানিয়েছে, ফ্লাইওভারের সেই সুড়ঙ্গে বসে তারা মাদক সেবন করে এবং ছিনতাই করার পর সেখানে লুকিয়ে থাকে।
পুলিশ জানায়, এই ছিনতাইকারী চক্রের প্রধান আকবর হোসেন। তার সহযোগী রবিউল হোসেন হৃদয়। তবে এ চক্রে আছে কয়েকজন নারী ছিনতাইকারী। তারা দিনের বেশির ভাগ সময় থাকত সুড়ঙ্গের ভেতর। রাতে সুযোগ বুঝে পথচারীকে কথার ফাঁদে ফেলে আটকে রাখত। পথচারীর কাছে মূল্যবান কিছু আছে বুঝতে পারলেই এক ধরনের সাংকেতিক শব্দ করলে সুড়ঙ্গ থেকে দেশী অস্ত্র নিয়ে পথচারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত সহযোগীরা। পরে ছিনতাই করে নারী সদস্যদের নিয়ে নিরাপদে সুড়ঙ্গে উঠে যেত আকবর। সুড়ঙ্গের ভেতর তারা অনৈতিক কাজেও লিপ্ত ছিল।
মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে রাতে হেঁটে ও মোটরসাইকেলে চলাচলকারী পথচারীদের টার্গেট করত ছিনতাইকারী চক্রের নারী সদস্যরা। তারা পথচারীদের প্রথমে অনৈতিক কাজের প্রস্তাব দিত। কেউ রাজি হলে রশি ও কাঠের মই দিয়ে সুড়ঙ্গের মধ্যে নিয়ে যেত। তারপর তার সবকিছু কেড়ে নিত। কেউ যেতে রাজি না হলে সাংকেতিক শব্দ করে সহযোগীদের ডাকত। পরে আকবরসহ তার সহযোগীরা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত।
পুলিশ জানায়, গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ঘিরে বেরিয়ে আসে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। আরামবাগের একটি প্রেসের কর্মচারী শামীম আহমেদ মিরপুরের বাসায় ফিরছিলেন। রাজধানীর মগবাজারের কাছে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পাশ থেকে ফ্লাইওভারে ওঠার পর তার মোটরসাইকেল নষ্ট হয়ে যায়। উপায়ান্তর না দেখে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে ঠেলে মোটরসাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলেন।
মধ্যরাতে মোটরসাইকেল নিয়ে বিপাকে পড়া শামীমকে সতর্ক হয়ে মোটরসাইকেল ঠেলার পরামর্শ দেয় অচেনা দুই নারী। তারা বলে, রেলিং ঘেঁষে না চললে শামীম দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। কথায় কথায় শামীমের শুভাকাক্সক্ষী হয়ে ওঠার চেষ্টা করে তারা। এরপরই এক ধরনের সাংকেতিক শব্দ করে দুই নারী। ওই শব্দ পেয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিন-চারজন চাপাতিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শামীমকে ঘিরে ধরে। ফ্লাইওভারের ওপরেই তাকে কুপিয়ে আহত করে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। শামীম দেখতে পান, তার চোখের সামনেই ছিনতাইকারী চক্রের সবাই ফ্লাইওভারের একটি সুড়ঙ্গে লুকাচ্ছে। শামীমের অভিযোগ পাওয়ার পরই অভিযানে যায় পুলিশ। খোঁজ পায় রহস্যময় সুড়ঙ্গ ও ছিনতাইকারী চক্রের।
সেখান থেকে তিন নারীসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। এ সময় পালাতে গিয়ে এই চক্রের প্রধান আকবর ফ্লাইওভার থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। আটক হওয়া আকবরের সঙ্গীদের নাম নাসরিন, রানী ও শেফালী। ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আকবর পুলিশ ও সাংবাদিকদের জানায়, ওই সুড়ঙ্গে মাদক সেবন, ছিনতাই ও নানা অপরাধমূলক কার্যকলাপ করে নিরাপদে লুকিয়ে থাকত তারা। ওই সুড়ঙ্গে তারা চারজন ছিল।
তবে এই চক্রের সাথে আরো কারা জড়িত আছে এবং কাদের আগাগোনা ছিল, সে বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ।



